যেভাবে মিনা পাল থেকে ‘কবরী’

বাংলাপ্রেস ডেস্ক
১৭ এপ্রিল, ২০২১

বাংলাপ্রেস ডেস্ক: ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্মগ্রহণ করেন মিনা পাল। সুতরাং ছবিতে প্রথম অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে নতুন নাম হয় কবরী। বাবা শ্রীকৃষ্ণদাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। তারপর টেলিভিশন ও সবশেষে সিনেমায়। কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে তাঁদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কবরী পাঁচ সন্তানের মা। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের সুতরাং ছবির মধ্যে দিয়ে সিনেমায় অভিষেক, সেসময়ই নতুন নাম হয় কবরী। ‘সুতরাং’ সিনেমার কিশোরী কবরী দর্শকদের কাছে যে এতটা জনপ্রিয়তা পাবে, সেটা তিনি ভাবতেই পারেননি।
শুরুর দিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে তাকে প্রচুর রিহার্সাল করতে হয়েছিল ‘ভাষা থেকে চাঁটগাইয়া আঞ্চলিক টান’ এবং কথায় ‘নাকি নাকি ভাব’ দূর করতে।
কবরীর ভাষায়: “চোখ তুলে তাকাতে সাহস পেতাম না, খুব লজ্জা পেতাম। সব দত্তদা (সুভাষ দত্ত) শিখিয়েছেন। কিন্তু ‘সুতরাং’এর পর আমাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।”
১৪ বছর বয়সে মিনা পাল নামের এক কিশোরী পেটে গামছা প্যাঁচানো পুঁটলি বেঁধে গর্ভবতী নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, সেই সূচনা। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা কবরীর আবির্ভাব। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য রীতিমতো খুঁজে বের করা হয়েছিল তাকে। কবরী লিখেছেন, ‘আলো ঝলমল ঢাকা শহর, মিনার চোখে স্বপ্ন। বাংলার মানুষের মনে এক চিলতে ঠাঁই করে নেওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম, অনেক সংগ্রাম। কত নতুন কিছু বুঝতে হবে, জানতে হবে, শিখতে হবে। নিজেকে তৈরি করতে হবে। এক হাজার ১১ টাকা পুঁজি নিয়ে বাংলার সাত কোটি মানুষের হৃদয় দখল নেওয়া ছিল অনেক কঠিন কাজ।’ চলচ্চিত্রে কাজ শুরুর পর ফিরিঙ্গি বাজারের কিশোরী মিনার নাম বদলে সুভাষ দত্ত তার পর্দা নাম রাখলেন কবরী।
তিনি বলেন, “আমিও ধীরে ধীরে মিনার খোলস পাল্টে কবরী মোড়কে বন্দি হয়ে গেলাম। রূপালি পর্দার ‘কবরী’ হয়ে গেল জীবনের পরিচয়। কী ভেবে বা কী দেখে দত্তদা আমায় চলচ্চিত্রে নিয়েছিলেন, তা আজও ভেবে পাইনি। আমি কী রকম দেখতে ছিলাম, ফর্সা, না কালো, লম্বা না বেটে, সুন্দরী না পচা, আমার নাক বোঁচা নাকি খাড়া মনেও পড়ে না। এটুকু শুধু মনে পড়ে, ছোটবেলায় ছিলাম দুরন্ত। মা বলতেন, ‘পাড়া চরনি’। সেই পাড়া চরনি যখন ‘সুতরাং’ ছবির নায়িকার জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছে, তখন দত্তদা (সুভাষ দত্ত) বললেন, ‘সংলাপ বলো, ‘অ্যাই ছাড়ো, কেউ দেখে ফেলবে।’ দেখি তুমি অভিনয় করতে পারবে কি-না?’ আমি সাহস পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে, বুকের ভেতর কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে। মনে মনে বাবাকে অভিশাপ দিচ্ছি- এত লম্বা কথা আমি কী করে বলব! আর এই লোকটা তো আচ্ছা পাজি! নিষ্ঠুর। দত্তদা বললেন, চুপ করে আছো কেন? তারপর কী ভেবে বললেন, বল প্লিজ, বল। স্বস্তি পেয়ে আস্তে আস্তে বললাম। সংলাপ শুনে তিনি বললেন, ‘এ তো দেখি চাটগাঁইয়া গলার সুর। উহু চলবে না। কথা ঠিক করে বলতে হবে।’ এভাবেই ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। এখনও মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা।”
কবরীকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে। তার ভুবন ভোলানো হাসি আর হৃদয়ছোঁয়া অভিনয়ে মুগ্ধ সব বয়সী দর্শক। তিনি যখন রূপালি পর্দায় অপরিহার্য, সে সময়ে একটি কথা প্রচলিত ছিল- ‘কবরী হাসলেও লাখ টাকা, কাঁদলেও লাখ টাকা। অর্থাৎ তার অভিনয় এতটাই নিখুঁত যে, তিনি বাংলার সব শ্রেণির দর্শকের কাছে পাশের বাড়ির সেই মেয়েটি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। পাশের বাড়ির মেয়েটির সুখ-দুঃখ যে কারও মনে রেখাপাত করতে পারে, যে কারণে তার হাসি বা কান্না দুয়েরই অর্থমূল্য ছিল। নির্মাতারা ছবিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিশ্চিত থাকতে পারতেন।
কবরী বলেন, ‘অনেক গুণী মানুষের সাহচর্য পেয়েছি আমি। চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে পড়াশোনাও শেষ করার সুযোগ পাইনি। তবে জ্ঞানী-গুণী মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা, বই পড়ে, মানুষ দেখে দেখে আমি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা কত কিছুই তো বুঝতাম না!’ অভিনেত্রী কবরী অকপটে বললেন, অনেকটা না বুঝেই অভিনয় শুরু করেছিলাম। কিছুই জানতাম না। এখনও যখন ‘সুতরাং’ দেখি, ছবিটি প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী মনে হয়। আমি কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোইনি ঠিক, কিন্তু মনের মধ্যে একটা আকুতি ছিল। সবসময় সঠিকভাবে কাজটি করতে চেয়েছি। ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিয়েছি। ভালো লাগা থেকে অভিনয়ে নিবেদিত হওয়া। সত্যি বলতে, দত্তদা আমাকে অভিনয় শিখিয়েছেন, সত্যদা এবং জিএম মান্নান সাহেব গান শিখিয়েছেন, আশু কাকা (রূপসজ্জাকর) সাজসজ্জা শিখিয়েছেন। এভাবে একটু একটু করে পা ফেলেছি। দিনে দিনে অনেক গুণী মানুষের ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছি। জ্ঞানী-গুণী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। এসবই আমার সম্বল।’
কবরী বলেন, তার প্রথম নায়ক সুভাষ দত্ত তাকে ঠিক উচ্চারণে সংলাপ বলা শিখিয়েছেন। কবরী জহির রায়হানের ‘বাহানা’ ছবিতে শুধু কাজ করেছেন। জহির রায়হান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিনি বলতেন, বিবিসি দেখো, ইংরেজি বই পড়ো।’ আর খান আতা যেন হাতে ধরে শিখিয়েছেন সব কাজ। ধমক দিতেন যেমন, আদরও করতেন তেমনি। চলচ্চিত্রের অনেক খুঁটিনাটি খান আতার কাছ থেকেই শেখা।
এরপরের দুই দশকে ‘রংবাজ’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘দ্বীপ নেভে নাই’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বৌ’য়ের মত বহু ব্যবসা সফল এবং আলোচিত সিনেমায় প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন।
বিপি।এসএম