২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিসিএস ক্যাডার থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: সালাহউদ্দিন আহমেদের রাজনীতি, নির্বাসন ও পরিবারের পথচলা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
বিসিএস ক্যাডার থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: সালাহউদ্দিন আহমেদের রাজনীতি, নির্বাসন ও পরিবারের পথচলা

সপরিবারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ

প্রশাসনের চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে; নয় বছর ভারতে কাটিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন, দুই ছেলে ও দুই মেয়ের উচ্চশিক্ষার পথও দেশের বাইরে

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। এরপর সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন, ২০১৫ সালে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া, ভারতের শিলংয়ে সন্ধান পাওয়া, দীর্ঘ নয় বছর পর দেশে ফেরা—আর এখন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রায় চার দশকের কর্মজীবনে তাঁর পথচলায় প্রশাসন, রাজনীতি, আইনি লড়াই এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতির একাধিক অধ্যায় রয়েছে। বর্তমানে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে তাঁর পরিবারও। স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমেদ। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে—সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ, পারমিস আহমেদ ইকরা, সাঈদ ইউসুফ আহমেদ ও ফারিবা আহমেদ রাইদা। প্রকাশ্য জীবনীসূত্রেও তাঁদের চার সন্তানের তথ্য পাওয়া যায়।

বিসিএস দিয়ে কর্মজীবনের শুরু

সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের তৎকালীন চকরিয়া উপজেলার, বর্তমানে পেকুয়া উপজেলার, সিকদারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এলএলবি (অনার্স) ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি সংসদ সদস্য এবং ২০০১–২০০৬ মেয়াদে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ২০২৬ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

স্ত্রী হাসিনা আহমেদও ছিলেন সংসদ সদস্য

সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমেদ নিজেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি কক্সবাজার-১ আসন থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তবে ২০১৫ সালে সালাহউদ্দিন আহমেদের অন্তর্ধানের পর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে স্বামীর সন্ধানে হাসিনা আহমেদের ভূমিকা বেশি আলোচিত হয়।

সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাজীবন

সালাহউদ্দিন-হাসিনা দম্পতির চার সন্তান। আপনার সরবরাহ করা পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠ ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন। পরে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট থেকে ফিন্যান্স এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন থেকে ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। আপনার তথ্য অনুযায়ী, তিনি আর্থিক খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত।

বড় মেয়ে পারমিস আহমেদ ইকরা সম্পর্কে আপনার দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, তিনি যুক্তরাজ্যের বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে মাইক্রোবায়োলজি ও মলিকুলার বায়োলজি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং লন্ডনে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।

দ্বিতীয় ছেলে সাঈদ ইউসুফ আহমেদ কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকাউন্টিং ও ফিন্যান্স বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে করপোরেট ও আর্থিক খাতে কাজ করছেন বলে পারিবারিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

কনিষ্ঠ মেয়ে ফারিবা আহমেদ রাইদা ঢাকার স্কলাস্টিকায় পড়াশোনার পর কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

তবে সন্তানদের এসব শিক্ষাগত ও বর্তমান পেশাগত পরিচয়ের পূর্ণ বিবরণ নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বা সংবাদসূত্রে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অথবা পরিবারের কাছ থেকে তথ্যগুলো যাচাই করা সমীচীন হবে।

২০১৫ সালের অন্তর্ধান থেকে শিলং

সালাহউদ্দিন আহমেদের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় শুরু হয় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ। সে সময় তিনি ঢাকার উত্তরায় অবস্থান করছিলেন। তাঁর পরিবার ও বিএনপির অভিযোগ ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। প্রায় দুই মাস তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

৬২ দিনের বেশি সময় পর, ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে তাঁর সন্ধান মেলে। ভারতীয় পুলিশ তাঁকে আটক করে এবং বৈধ ভ্রমণ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা হয়। সালাহউদ্দিন কীভাবে বাংলাদেশ থেকে শিলংয়ে পৌঁছেছিলেন, তা নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক ও রহস্য ছিল।

২০১৮ সালের অক্টোবরে শিলংয়ের একটি আদালত তাঁকে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে উচ্চতর আদালতও সেই রায় বহাল রাখে এবং তাঁর বাংলাদেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেয়।

স্বামীকে দেখতে শিলংয়ে ছুটে যান হাসিনা

সালাহউদ্দিনের সন্ধান পাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদ ভারতীয় ভিসা নিয়ে ২০১৫ সালের ১৭ মে ঢাকা থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন। কলকাতা থেকে তিনি গুয়াহাটি হয়ে শিলং পৌঁছান। সেখানে শিলং সিভিল হাসপাতালে স্বামীর সঙ্গে তাঁর আবেগঘন পুনর্মিলন হয়। সমসাময়িক সংবাদে বিএনপির তৎকালীন সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল লতিফ জনির শিলংয়ে উপস্থিত থাকার তথ্যও পাওয়া যায়।

নয় বছর পর দেশে ফেরা

ভারতে আইনি জটিলতা ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে সালাহউদ্দিন আহমেদের দেশে ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অবশেষে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট, নয় বছরের বেশি সময় পর, তিনি দিল্লি থেকে বিমানে ঢাকায় ফেরেন। বিমানবন্দরে বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী তাঁকে স্বাগত জানান।

তাঁর ২০১৫ সালের অন্তর্ধান নিয়ে বিএনপি ও পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে তাঁকে বাংলাদেশ থেকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে সালাহউদ্দিন নিজেও এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করেন।

সম্পদ ও ব্যবসা নিয়ে যা বলছে নির্বাচনী হলফনামা

সালাহউদ্দিন আহমেদের আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থার কিছু তথ্য তাঁর ২০২৫ সালের নির্বাচনী হলফনামায় প্রকাশ পেয়েছে। হলফনামা বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর পেশা আইন ও ব্যবসা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁর ঘোষিত মোট সম্পদের মূল্য প্রায় ১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা বলে জানানো হয়েছে।

ঘোষিত স্থাবর সম্পদের মধ্যে পেকুয়ায় কৃষি ও অকৃষি জমি, একটি তিনতলা বাড়ি এবং ঢাকার গুলশানে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া পেকুয়ায় প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খামারের তথ্যও হলফনামায় রয়েছে। তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদের নামে কক্সবাজারের কলাতলীতে ছয়তলা ভবনসহ জমি ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এই তথ্যগুলো ব্যক্তিগত অনুমান নয়; নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামার ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ।

প্রশাসন থেকে রাজনীতি, শিলং থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

সালাহউদ্দিন আহমেদের জীবনের গতিপথ তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৮৫ সালের বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা থেকে তিনি রাজনীতিতে আসেন; সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হন; ২০১৫ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর শিলংয়ে তাঁর সন্ধান মেলে; দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে নয় বছর পর দেশে ফেরেন; এবং ২০২৬ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদও রাজনীতি ও পারিবারিক সংকট—দুই ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছেন। আর তাঁদের চার সন্তান নিজেদের শিক্ষা ও পেশাজীবনের পথ অনুসরণ করেছেন দেশে ও বিদেশে।

একটি রাজনৈতিক পরিবারের গল্প হিসেবে তাই সালাহউদ্দিন আহমেদের পরিবারকে শুধু ক্ষমতা বা পদ দিয়ে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এখানে রয়েছে প্রশাসনিক চাকরি থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, নয় বছরের ভারত অধ্যায়, পরিবারের বিচ্ছিন্নতা, প্রত্যাবর্তন এবং নতুন সরকারি দায়িত্ব—একাধিক পর্বে বিস্তৃত একটি পারিবারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি