১২ আগস্ট ২০২৬

বৃত্তাকার নৌপথ চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, প্রধান বাধা নিচু সেতু !

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
বৃত্তাকার নৌপথ চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, প্রধান বাধা নিচু সেতু !

বাংলাপ্রেস ডেস্ক: রাজধানী ঢাকার দমবন্ধ করা যানজট নিরসন, সাশ্রয়ী পণ্য ও যাত্রী পরিবহন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোকে ঘিরে ‘বৃত্তাকার নৌপথ’ পুনরায় সচল করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সম্প্রতি সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিশেষ সভাকক্ষে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নদী দূষণ প্রতিরোধ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নাব্যতা স্বাভাবিক রাখা এবং নদী তীরের সৌন্দর্যবর্ধনে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতীতে সরকারি ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক ব্যর্থতা কাটিয়ে এবার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ‘ওয়াটার বাস’ ও ‘ওয়াটার ট্যাক্সি’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর এই ইতিবাচক নির্দেশনার বিপরীতে বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত অবকাঠামো। একদিকে গত আড়াই দশকের কোটি কোটি টাকা অপচয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে সরকারি সংস্থাগুলোরই আইন অমান্য করে নির্মিত প্রয়োজনের তুলনায় মারাত্মক নিচু সেতু—এই দ্বিমুখী সংকটে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথের ভবিষ্যৎ।

রাজধানীর বাড্ডায় আফতাবনগর ও বনশ্রীর মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে রামপুরা খালে (প্রকৃতপক্ষে নড়াই নদী) ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি সেতু নির্মাণ করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে এর নির্মাণকাজ শুরু হলেও, সম্প্রতি নদীর ওপর গার্ডার বসানোর পর দেখা গেছে—পানির স্তর থেকে সেতুর উচ্চতা মাত্র ১ থেকে ২ মিটার। নৌচলাচলের পথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে এত নিচু করে সেতু নির্মাণের প্রতিবাদে গত ৯ আগস্ট ওই সেতুর পাশে ‘নোঙর বাংলাদেশ’ সংগঠনের পরিবেশবাদীরা মানববন্ধন করেছেন। তাদের সুস্পষ্ট দাবি, নৌ-চলাচল সচল রাখতে সেতুর ক্লিয়ারেন্স অন্তত ১১ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক।

তবে শুধু এই সেতুটির ক্ষেত্রেই নয়; আশুলিয়া সেতু, আমিনবাজার সেতু, টঙ্গী এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও রেলসেতু এবং কামারপাড়া সেতুর উচ্চতা এতটাই কম যে, সামান্য বর্ষা বা পানির স্তর বাড়লেই এগুলোর নিচ দিয়ে যাত্রীবাহী ওয়াটার বাস, লঞ্চ কিংবা কার্গো চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি নদী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রেজারগুলোও এসব সেতুর নিচে আটকে পড়ে। ফলে ঢাকায় বৃত্তাকার নৌপথের ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই রয়ে যাচ্ছে।

রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা—এই চার নদ-নদীর প্রায় ১১০ কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে। শহরের অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে ২০০০ সাল থেকে দফায় দফায় বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএ-এর মাধ্যমে নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

প্রথম ধাপ (২০০০–২০০৫): ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আশুলিয়া থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সাড়ে ২৯ কিলোমিটার নৌপথ খনন এবং ১০টি ল্যান্ডিং স্টেশন ও ৭টি টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপ (২০০৭–২০১০): সাড়ে ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে আশুলিয়া থেকে টঙ্গী হয়ে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার নৌপথ উন্নয়ন ও ৩টি ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি হয়। ১২টি ওয়াটার বাস ক্রয় ও পরিচালনায় বিআইডব্লিউটিসি ব্যয় করে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা। দুই দশকে বৃত্তাকার নৌপথে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২২ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা!

বাস্তব চিত্র দেখতে সম্প্রতি আশুলিয়া, সিন্নিরটেক ও গাবতলী ল্যান্ডিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোটি কোটি টাকায় নির্মিত দোতলা ভবন ও পন্টুনগুলো বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। পন্টুন ঘিরে জমছে কচুরিপানা, ভবনের দরজা-জানালা খোলা, আর গাবতলী ল্যান্ডিং স্টেশনের খালি কক্ষে বর্তমানে তৈরি হচ্ছে বাঁশের জিনিসপত্র।

অন্যদিকে, যাত্রীদের সেবায় কেনা ১২টি ওয়াটার বাসের ৯টিই এখন চরম জরাজীর্ণ ও অচল। পুরান ঢাকার বাদামতলী ঘাটে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এসব ওয়াটার বাস এখন পুরোনো লোহালক্কড় (স্ক্র্যাপ) হিসেবে নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি। বাকি তিনটি ওয়াটার বাস বর্তমানে দূরবর্তী আরিচা-কাজীরহাট নৌপথে চালানো হচ্ছে।

১১০ কিলোমিটারের বিস্তৃত এই পথটি পুরো মাত্রায় কখনো চালু না হওয়ার পেছনে বিআইডব্লিউটিএ ও বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানে দুটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে। তা হচ্ছে- ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গী খাল, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর ওপর মোট ২৫টি সড়ক সেতু এবং ৩টি রেলসেতু রয়েছে।

২০১০ সালের ‘ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েস অ্যান্ড ফোরশোর রুলস’ অনুযায়ী নদীর শ্রেণিভেদে সেতুর উচ্চতা ১৬ থেকে ৬০ ফুট (ন্যূনতম ১১ মিটার) হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সড়ক ও জনপথ (সওজ), এলজিইডি ও সিটি করপোরেশন তা তোয়াক্কা করেনি।

আফতাবনগর-বনশ্রীর সংযোগ বাড়াতে রামপুরা খালে (নড়ই নদী) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩টি সেতু নির্মাণ করছে। সেগুলোর গার্ডার বসানোর পর দেখা গেছে, পানির স্তর থেকে সেতুর উচ্চতা মাত্র ১ থেকে ২ মিটার! পরিবেশবাদী সংগঠন ‘নোঙর বাংলাদেশ’ একে ‘জলপথ হত্যা’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শুরু করেছে।

পানির স্তর সামান্য বাড়লেই আশুলিয়া, আমীনবাজার, কামারপাড়া বা টঙ্গী ব্রিজের নিচ দিয়ে ওয়াটার বাস তো দূরের কথা—নদী খনন ও সুরক্ষার ড্রেজার পর্যন্ত চলাচল করতে পারে না। এছাড়া নদীর তীব্র দূষণ ও পানির দুর্গন্ধের কারণে যাত্রীরা নৌপথে যাতায়াতে আগ্রহ হারান। এর ওপর যুক্ত হয়েছিল প্রশাসনিক গাফিলতি। নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের অভিযোগ—যানজট এড়াতে ওয়াটার বাসে এলে চালকদের দীর্ঘ বিলম্বের কারণে ঘাটে বসেই সময় নষ্ট হতো, ফলে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নেন।

নদী বা জলাশয়ভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা যে বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি। দুর্গন্ধ থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়সূচি ও সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনার কারণে হাতিরঝিলে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ যাতায়াত করছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান এবং বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হকের মতে, ব্যক্তি-ইচ্ছায় বা অপরিকল্পিতভাবে ৬০০ কোটি টাকার ডেমু ট্রেন বা অতীতের ওয়াটার বাস কেনার মতো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলে আবার টাকা অপচয় হবে। দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা ছাড়া কাজ করা যাবে না।

চিহ্নিত ২০-২২টি নিচু সেতুর কারিগরি ত্রুটি সংশোধন বা উঁচু করে পুনর্নির্মাণ না করা পর্যন্ত বড় কোনো নৌযান বা কার্গো চালানো অসম্ভব। বিআইডব্লিউটিএ-এর ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের কেবল সড়ক উন্নয়ন ও যানবাহনের বাজারের দিকে নজর না দিয়ে সমন্বিত নদীভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণে মনোযোগী হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নতুন নির্দেশনায় এবার বিআইডব্লিউটিএ-এর তদারকিতে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত প্রাথমিক ধাপে নৌপথ চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তবে নদী দূষণমুক্ত করা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর নির্মিত নিচু সেতুগুলোর স্থায়ী সমাধান না করে নতুন করে প্রজেক্ট হাতে নিলে—কোটি কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ বারবার জলেই যাবে এবং ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথের ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধকারে ঢাকা পড়বে।
বিপি/টিআই

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি