১ নভেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গুতে চলতি বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যু অক্টোবরে

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০ পিএম
ডেঙ্গুতে চলতি বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যু অক্টোবরে

বাংলাপ্রেস ডেস্ক: দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে গেলেও কমছে না মশাবাহিত এ রোগের সংক্রমণ। বরং চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বছরের অন্য যেকোনো মাসকে ছাড়িয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবরেই ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৯। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি বলছে, ডেঙ্গু এখনো দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক বুলেটিনে জানানো হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৩৩ জন। মৃত ব্যক্তির বাড়ি খুলনা বিভাগে। নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির এ সংখ্যা প্রমাণ করছে, সংক্রমণের চাপ এখনো যথেষ্ট বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুতে ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বরে মারা যান ১৪৮ জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবর মাসে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। বছরের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মৃত্যুর ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিলে এ মাসেই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ রোগী

গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৬৩৩ জন রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬০৪ জন ঢাকা বিভাগের। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণের চাপ এখনো বেশি রয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮১ জন, বরিশালে ২৩৪ জন, খুলনায় ২২৮ জন, রাজশাহীতে ১৪৯ জন, ময়মনসিংহে ৭০ জন এবং রংপুর বিভাগে ৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা নয়। দেশের প্রায় সব বিভাগেই রোগীর উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগে নতুন রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফলে বিভাগীয় শহরগুলোর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মশা নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি রোগী লাখ ছাড়িয়েছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩৫ জন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৪৫ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও নতুন রোগীর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মৌসুমে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় ও সেবার মানের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

মৃত্যুর দিক থেকে ২০২৩ সাল ছিল ভয়াবহ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। এসব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। একই বছর ডেঙ্গুতে মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন, যা দেশে এ রোগে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।

অন্যদিকে ২০২৫ সালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই বছর এ রোগে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের বেশি। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৪১৯-এ পৌঁছেছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এ বছর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসাসেবা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে বংশবিস্তার করে। বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবন ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কোথাও পানি জমে থাকতে না দেওয়া, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং আক্রান্ত এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সারা বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শুধু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর মশা নিধন অভিযান চালালে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো দরকার।

অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে। নভেম্বরেও সংক্রমণের পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। জনসচেতনতা, নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি—এই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

বিপি/টিআই

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি