২৫ মে ২০২৬

কাবার ভেতরটা কেমন, আর চারপাশে কী দিয়ে ঢাকা? জানুন অজানা ইতিহাস

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
কাবার ভেতরটা কেমন, আর চারপাশে কী দিয়ে ঢাকা? জানুন অজানা ইতিহাস

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাপ্রেস ডেস্ক:   বিশ্ব মুসলিমের হৃদস্পন্দন পবিত্র কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বার্ষিক হজ উৎসব। লাখো কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত পবিত্র মক্কা নগরী। প্রতিবছর হজের সময় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ মুসলিম কাবার চারদিকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সাতবার প্রদক্ষিণ বা তাওয়াফ করে এই দীর্ঘযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। দূর থেকে কাবার যে নয়নকাড়া কালো অবয়ব চতুষ্পার্শ্বকে মোহিত করে, তা মূলত খাঁটি রেশম এবং সোনা-রুপার সুতোয় বোনা একটি চাদর, যার নাম কিসওয়াহ।

পবিত্র কাবা শরিফ হলো ইসলামের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান, যা মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। আরবি শব্দ ‘কাবা’র অর্থ ঘনক। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই মুসলিমরা এই কাবার দিকে মুখ করে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন, যা কিবলা নামে পরিচিত। এই একক দিকনির্দেশনা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিমকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে। কাবার কাঠামোগত পরিমাপ অনুযায়ী এটি উচ্চতায় প্রায় ১৩.১ মিটার, দৈর্ঘ্যে ১২.৮ মিটার এবং প্রস্থে ১১.০৩ মিটার।

ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) এই পবিত্র ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এই ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ রয়েছে। ইসলাম-পূর্ব যুগেও এটি বিভিন্ন আরব গোত্রের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কাবা প্রাঙ্গণকে মূর্তিমুক্ত করে একত্ববাদী ইবাদতের মূল কেন্দ্রে রূপান্তর করেন।

বাইরে থেকে কাবা শরিফের জাঁকজমক দৃশ্য চোখে পড়লেও এর ভেতরের অংশটি অত্যন্ত সাদামাটা ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। কাবার উত্তর-পূর্ব দিকে মাটির চেয়ে প্রায় দুই মিটার উঁচুতে একটি স্বর্ণনির্মিত প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি এই দরজাটির উচ্চতা ৩.১ মিটার এবং প্রস্থ ১.৯ মিটার। বছরে সাধারণত দুবার বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কাবার অভ্যন্তরভাগ ধৌত করার জন্য এই দরজাটি খোলা হয়। 

কাবার ভেতরে রয়েছে ছাদকে ধরে রাখা তিনটি প্রাচীন কাঠের স্তম্ভ এবং ছাদে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি। মেঝে এবং দেয়ালগুলো মার্বেল পাথরে মোড়ানো এবং সিলিং থেকে ঝুলছে সুদৃশ্য সব লণ্ঠন। কাবার ভেতরের দেয়ালগুলো ঐতিহ্যগতভাবে লাল, সবুজ বা গাঢ় নীল রঙের জিগ-জ্যাগ নকশার কাপড়ে ঢাকা থাকে।

কাবার বাইরের অংশকে আবৃত করে রাখা এই কালো রেশমি কাপড় বা কিসওয়াহর নামকরণ হয়েছে আরবি শব্দ কাসা থেকে, যার অর্থ ঢেকে রাখা বা চাদর জড়ানো। হজের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় এবং স্পর্শ থেকে সুরক্ষার জন্য এই গিলাফের নিচের অংশটি কিছুটা ওপরে গুটিয়ে রাখা হয়। কিসওয়াহর মূল অংশটি তৈরি হয় ৪৭টি খণ্ডে বিভক্ত ১৪ মিটার উঁচু রেশমি কাপড় দিয়ে। এর ওপরের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে প্রায় ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ৪৭ মিটার দীর্ঘ একটি স্বর্ণখচিত বেল্ট বা হিজাম। আর কাবার দরজার ওপর ঝোলানো পর্দাটিকে বলা হয় ‘সিতারা’ বা ‘বুরকু’, যা কিসওয়াহর সবচেয়ে অলংকৃত ও আকর্ষণীয় অংশ।

কাবাকে গিলাফ দিয়ে ঢেকে রাখার প্রথাটি প্রাক-ইসলামী যুগ থেকেই চলে আসছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল এই পবিত্র ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। ঐতিহাসিকদের মতে, ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আসআদ কামিল সর্বপ্রথম ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে কাবা শরিফকে সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত করেছিলেন। ইসলামী খেলাফতের যুগে কাবার গিলাফ তৈরির দায়িত্ব রাজনৈতিক প্রভাবের সাথে পরিবর্তিত হতো। 

প্রাথমিক যুগে আরবের বাইরে মিশরের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কারখানায় কিসওয়াহ তৈরি হতো এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাফেলার মাধ্যমে তা মক্কায় নিয়ে আসা হতো। পরবর্তীতে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে যথাক্রমে সিরিয়া এবং বাগদাদেও এটি তৈরি হয়েছে। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর কিসওয়াহ তৈরির একক গৌরব ও দায়িত্ব লাভ করে সৌদি আরবের আল সৌদ রাজপরিবার।

বর্তমানে মক্কার নিজস্ব কিসওয়াহ কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি, ঐতিহ্যবাহী তাঁত এবং ক্যালিগ্রাফি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ২৪০ জনেরও বেশি শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই গিলাফ তৈরি করা হয়। ইতালি থেকে আমদানিকৃত কাঁচা রেশমকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ধুয়ে ও রং করে কিসওয়াহর রূপ দেওয়া হয়। একটি কিসওয়াহ তৈরিতে আনুমানিক ৬৭০ কেজি প্রাকৃতিক রেশম, ১২০ কেজি ২৪-ক্যারেট সোনার সুতো এবং প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি রুপার সুতো প্রয়োজন হয়। সমসাময়িক বাজারে এই বিশাল যজ্ঞের পেছনে ব্যয় হয় প্রায় ২৫ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল (যা প্রায় ৬৬.৫ লাখ মার্কিন ডলারের সমতুল্য)। এই গিলাফের গায়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, তাওহিদের বাণী এবং হজের ফজিলত সম্পর্কিত ক্যালিগ্রাফি ফুটিয়ে তোলা হয়।

ইতিহাসে কিসওয়াহর রং সবসময় কালো ছিল না। বিভিন্ন যুগে এর রঙে পরিবর্তন এসেছে। উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে সাদা, সবুজ, লাল এবং হলুদ রঙের গিলাফ ব্যবহারের নজির রয়েছে। তবে আব্বাসীয় আমলের শেষভাগ থেকে কালো রংটি কিসওয়াহর স্থায়ী পরিচয় হিসেবে রূপ নেয়।

প্রতি বছর হজের সময় বিশেষায়িত একটি কর্মী দলের মাধ্যমে কাবার পুরনো গিলাফটি সরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি গিলাফ প্রতিস্থাপন করা হয়। পুরনো গিলাফটি নামানোর পর তা সরাসরি কিসওয়াহ কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বর্ণ ও রুপার সুতোয় বোনা মূল্যবান আয়াত সংবলিত অংশগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কেটে আলাদা করা হয়। এই বিশেষ টুকরোগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য কিংবা সৌদি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। অবশিষ্ট সাধারণ কাপড়ের অংশগুলো ছোট ছোট টুকরো করে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদ, ভিআইপি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে স্মারক হিসেবে বিতরণ করা হয়, যার কিছু অংশ পরবর্তীতে সংগ্রাহকদের হাত ধরে বিশ্ব বাজারেও স্থান পায়। সূত্র: আল-জাজিরা।

বিপি>টিডি

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

FIRDAUS FASHIONS


FIRDAUS FASHIONS

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি