৬ আগস্ট ২০২৬

করোনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অবসর যাপন

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৩৯ পিএম
করোনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অবসর যাপন

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ,জবি থেকে: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের আতঙ্কে এখন সারা বিশ। এই ভাইরাসের ছোবল বাংলাদেশেও আক্রমণ করেছে। দিনদিন বাড়ছে সংক্রমণের হার ও মৃত্যু সংখ্যা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখন নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। ঘরবন্দি অবস্থায় শিক্ষার্থীদের এই দিনগুলো কেমন কাটছে এ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন সাংবাদিক মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ইউছুব ওসমান বলেন, করোনাকালের এই সময়টাতে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি তা হলো, অবসর সময় কিভাবে কাটাচ্ছি। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন যার সাথেই কথা হয়েছে প্রায় প্রত্যেকেরই প্রশ্ন ছিল এটা। এর উত্তর সহজ হলেও একটু ভেবেচিন্তে দেওয়াই মনে হয় ভালো। নতুন বছরে নতুন স্বপ্ন নিয়ে জবি ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলাম। সাথে ছিল কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটাকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার তীব্র ইচ্ছা। কিন্তু করোনা নামক এই মমহামারি তাতে জল ঢেলে দিয়ে স্বপ্ন ভাঙ্গার পাশাপাশি হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছে। করোনার কারণে একদিকে ঘরে বন্দী জীবনযাপন কিছুটা বিরক্তিকর হলেও পরিবারের সাথে বেশি সময় কাটানোর আনন্দটা উপভোগ করছি বেশ। পড়ালেখার কারণে অনেকটা সময় পরিবারের থেকে দূরে ছিলাম বিধায় হয়তো এই আনন্দের পরিমাণটা খুব বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান, পরীক্ষাসহ প্রায় সকল শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পাঠ্যবই পড়া না হলেও সাহিত্য আর রোমাঞ্চকর কিছু বই পড়ে সময়টা মোটেই খারাপ যাচ্ছেনা। বরং বলা যায়, আমি নিজেই এক অন্য আমিকে আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছি। যা নিয়মিতভাবে চলা রুটিনের বাইরে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে! পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সাথে গল্পগুজব, বাবা-মা কে তাদের কাযে সহযোগিতা করে সময়টা ভালোই কাটছে। তবে মুক্ত আকাশে উড়ে চলা পাখির মতো জীবনের চাইতে এই আনন্দটা অতি নগন্যই। পৃথিবী দ্রুত সুস্থ হয়ে গেলে যখন প্রাণভরে এই ধরায় শ্বাস নিতে পারবো তবেই মিলবে পরিপূর্ণ শান্তি। এটাই এখন আমার প্রতিটি ক্ষণের চাওয়া। অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাও পৃথিবী, আবার বন্ধুদের মিলন মেলা হোক প্রতিটি দিন। আবার আনন্দে ভরে ওঠুক সবার জীবন।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা ইমু বলেন, ক্যাম্পাসের অলিগলি, আর সিনিয়র জুনিয়র মেলবন্ধন যখন আমাকে আকৃষ্ট করে ফেললো তখন মায়ের অসুস্থতা আমাকে বাড়ির পথ ধরতে বাধ্য করলো। ভেবেছিলাম কয়েকদিন পর আবার জমবে আড্ডা, ফিরে যাবো ক্যাম্পাসে, কিন্তু করোনা কালীন বন্ধ আমাকে আটকিয়ে দিল চারদেয়ালের মাঝে। দেখতে দেখতে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে , সকাল শুরু হচ্ছে মায়ের মুখ দেখে, পরিবারের সাথে কাটছে ভালো সময়। কবিতা লিখছি, লিখছি গল্প ও আবার ফেইসবুক চালিয়ে ও বেশ খানিকটা সময় চলে যাচ্ছে। খাবার টেবিলে ভাই বোনেদের সাথে হচ্ছে দুষ্ট মিষ্টি ঝগড়া, দাদা দাদুর সাথে বন্যার আর অনেক মিষ্টি অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে পরন্ত বিকেল কাটিয়ে দেওয়া হচ্ছে নিমিষেই, তবে সকালের চায়ের কাপ এ চুমুক দিতে দিতে পরে ফেলেছি অনেক গল্পের বই আর ভালোবাসা মিশ্রিত কয়েকটি উপন্যাস। বলা বাহুল্য ঘুম হচ্ছে বেশ। আবার ছোটবোন এর আবদার যখন তখন সাজিয়ে দিয়ে খুশি রাখতে হচ্ছে তাকে। ছোটভাই কে পড়াশোনার জন্য শাসন ও হচ্ছে খুব। গান শোনা, মুভি দেখা, নাটক দেখা ও হয়েছ এ শ'খানেক। ধর্ম চর্চা করে ও কাটছে সময়। বন্ধুদের সাথে কথা ও হচ্ছে কিন্তু মন খারাপ হচ্ছে তাদের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো কে মনে করে, হচ্ছে দীর্ঘশ্বাস। সুস্থ পরিবেশ এ একটা সুন্দর সকালে পাশাপাশি বসে আবার যেনো ক্লাস করতে পারি, চেনা মুখগুলো কে যেনো এবার সুস্থ অবস্থায় দেখতে পারি, দিতে পারি একসাথে চায়ের কাপে চুমুক, সেই প্রত্যাশায় ই কাটছে দিন,কাটছে সময়। সুস্থ হয় এ উঠুক পৃথিবী, ভালো থাকুক চেনা অচেনা সব মানুষ।

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, তিন মাস ধরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি কাটাচ্ছি। হঠাৎ করে এই অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে বাড়িতে এসে প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও পরে একটু কেমনই যেন লাগছিল। যারা বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করে, প্রায় সবারই পরিস্থিতি ঠিক এমনটাই। কিন্তু বিশ্ব আজ অসুস্থ, ঘরবন্দী হয়েই কাটাতে হবে পুরো ছুটি। প্রথম এক দুই মাস শুধু মুভি আর ড্রামা দেখে কেটেছিল ।পরে ভাবলাম এই বিশাল ছুটিকে হেলায় ফেলায় কাটিয়ে দিলে হবে না। কাজে লাগাতে হবে। নতুন কিছু শেখার প্রয়াস করতে লাগলাম।প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার, জানার প্রয়াস করলাম। বাসায় বসে বিশ্ব ইতিহাসকে কাছে থেকে জানারও উত্তম সময় এটা।তাই আমাদের পরম বন্ধু বইকে নিয়ে বসে পরলাম। পড়া শুরু করে দিলাম বিভিন্ন উপন্যাস, গল্প, নাটক ইত্যাদি। তথ্য ও প্রযুক্তির এই যুগে আবার কেন'ই বা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকব? শুরু করে দিলাম বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কোর্সসমূহ। এভাবেই আমার অবসর সময় পার হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া নওশিন বিন্তী বলেন, অন্যসবার মতোই এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধে নেমে পড়লাম। অনেক ব্যার্থতার পর সবশেষে আমার ভাগ্য পড়ে গেল পুরান ঢাকার অন্যতম এক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ভেবেছিলাম বন্ধুদের সাথে ভার্সিটির কয়েক বছর অনেক ভালো কাটবে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্ব থমকে যাওয়ার সাথে সাথে থেমে গেল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো জীবন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হল। একে অপরের সুস্থতার জন্য সকলকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান করা হল।তাই এই সময়ে আমার মতো সবাই ঘরে অবস্থান করে বিভিন্ন কাজ করে অবসর সময় কাটাচ্ছে। এই অবসর সময়ে আমি গল্পের বই পড়ে ও বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করার মাধ্যমে সময় পার করছি। পাশাপাশি ঘরে আম্মুকে কাজে সাহায্য করছি, আপুর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি,আব্বুর কাছ থেকে অনেক শিক্ষনীয় উপদেশ পাচ্ছি। মাঝেমধ্যেই নিজের পছন্দের কাজগুলো করছি যেমন-ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি অন্যরকম ইচ্ছে ছিল যা ব্যাস্ততার কারণে করা হয়ে উঠেনি। এখন তা করতে পারছি। এছাড়াও অনলাইন এখন বিনামূল্যে অনেক কোর্স করা যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে।ঘরে থাকার কারণে অনেক বিরক্তিবোধ হয় মাঝেমধ্যেই। কিন্তু তারপর ই মনে হয় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাকে সকল স্বাস্থ্যবিধী মেনে চলা‌ লাগবে। তাহলেই এ দেশ থেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা কমে যাবে। পরিশেষে সকলের কাছে অনুরোধ, ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন। আমরা সচেতন হলেই বেঁচে যাবে আমাদের দেশ।

ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিলা তাবাসসুম অন্তি বলেন, প্রতিদিন জীবনের নানা তাগিদে ছুটতে হতো সবাইকে। কিন্তু করোনা ভাইরাস সবাইকে ঘরবন্দী করে দিয়েছে । ভার্সিটি বন্ধের পর মনে হয়েছিল খুব দ্রুতই সবকিছু আবার তার প্রাণ ফিরে পাবে কিন্তু দেখতে দেখতে তিন মাসের বেশি সময় হয়ে গেল। কিন্তু এইসময়টা অতটাও খারাপ যাচ্ছেনা, হয়তো আমাদের পড়াশোনা বা দৈনন্দিন কাজগুলো আগের মতো হচ্ছে না কিন্তু পরিবারের সাথে সময় কাটানো হচ্ছে যা আমাদের ব্যস্ততার ভীড়ে হারিয়ে গিয়েছিল। এখন সময় যাচ্ছে পরিবারের সাথে সময় কাটিয়ে, মাঝে মাঝে পরিবারের জন্যে রান্নার মাধ্যমে, বন্ধুদের সাথে ফোনে আড্ডা দিয়ে, টুকটাক লিখালিখিও হচ্ছে এখন আর সাথে পুরনো দিনগুলো স্মৃতিচারণ করে। এখন যেন নতুনভাবে আবিষ্কার হচ্ছে পরিবারের গুরুত্ব কতটা। দিনের বেশি সময়টা কাটছে মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো ব্যবহার করে। অনলাইন থেকে বিভিন্ন জিনিস শেখার চেষ্টা করছি। খুব ভালো সময়টা কাটে রোজা জারার সাথে দুষ্টুমি করে, নানান আবদার শুনে। সবকিছুর মাঝে একটু পড়াশোনাও হয়েছিল কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। চারদিকে যখন সবার মধ্যে মৃত্যুভয় তখন মাঝে মাঝে আমাকেও ভাবিয়ে তোলে আবার কি ফিরে যেতে পারবো সেই আগের পৃথিবীতে যেখানে চারদিকে থাকবে আনন্দ, উল্লাস, খুশি। সকলে মিলে আবার নতুন করে বেঁচে উঠবে। আবার হয়তো বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে বলবো খুব মিস করেছি তোকে।

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী প্রকৃতি আশেক জানান, এই কোয়ারেন্টাইনে মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো মোবাইল। র্দীঘ তিন মাস ধরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবই বন্ধ। এই র্দীঘ সময়ের একটা ছুটিতে শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ সময় কাটাচ্ছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে, টিভি দেখার মাধ্যমে, অনলাইনে তাদের ফেভারিট সিরিজ গুলো দেখার মাধ্যমে। আজ কালকের এই ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোন সবার হাতেই বিদ্যমান। একটা মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই পুরো দুনিয়া আজ হাতের মুঠোয়। চাইলেই যে কোন কিছু সম্ভব হচ্ছে এই মোবাইল ফোন এর মাধ্যমে। আসলে অনেক কঠিন একটা সময় পার করছে আমাদের দেশের মানুষ। সারাদিন বাসায় শুয়ে-বসেই সময় পার করছি আমরা। হয়তো কিছুক্ষণ ফোন টিপছি, কতক্ষণ ফেইসবুক চালাচ্ছি তো আবার কিছুক্ষণ পর বন্ধু দের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছি, আবার কিছুক্ষণ পর বন্ধুদের সাথে লুডো খেলছি, ইউটিউবে বসে কিছু রান্নার ভিডিও দেখছি, বেশ কিছু নতুন মজাদার আইটেম ট্রাই করছি। আবার ইউটিউবে বসে কিছু ইংরেজি কোর্স করছি। বাবা-মার সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছি, এভাবে করেই সময় গুলো পার হয়ে যাচ্ছে। জানি না এভাবে আর কত দিন কাটবে।কিন্তু একদিন আশা করি ভালো সময় আসবেই যেদিন করোনা ভাইরাস বলে আর কিছু থাকবে না, যেদিন আবার সকাল সকাল উঠতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় বাস ধরার জন্য, যেদিন আবার সব বন্ধু দের সাথে দেখা হবে, এক সাথে বসে চা খাওয়া হবে, যেদিন শান্ত চত্ত্বরে বসে সবাই আগের মতো আড্ডা দিবো, বিবিএ এর সিড়িঁতে বসে সবাই হয়ত এক সাথে আবার বৃষ্টি দেখবো।

বিপি/কেজে

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি