নাগরিকত্ব অধিকারের ওপর ট্রাম্পের নতুন আক্রমণ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ
আবু সাবেত: ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ অভিবাসন অভিযান এখন শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের জীবনেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে রয়েছেন গ্রিন কার্ডধারী, ভিসা আবেদনকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের পরিবার।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসন আইনজীবী ও আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ড ও নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ায় বাড়তি নজরদারি এবং কঠোর যাচাইয়ের অভিযোগ করছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ভ্রমণ ইতিহাস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এখন বাড়তি পর্যবেক্ষণের আওতায় আসছে।
এই অনিশ্চয়তার পেছনে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতি, যার লক্ষ্য অভিবাসনের পথ সংকুচিত করা এবং নাগরিকত্ব সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক সুরক্ষাগুলো পুনর্বিবেচনা করা।
এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী অনুযায়ী, দেশটিতে জন্মগ্রহণকারী প্রায় সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পেয়ে থাকে।
সপ্তাহান্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রক্ষণশীল ভাষ্যকার মার্ক লেভিন-এর একটি বক্তব্য পুনঃপোস্ট করেন, যেখানে বলা হয়েছিল,'জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আমাদের দেশের জন্য আত্মহত্যার শামিল!'
সমালোচকদের মতে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক ভাষ্য ক্রমেই আতঙ্ক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। তাদের অভিযোগ, অভিবাসনকে এখন কেবল নীতিগত বিতর্ক হিসেবে নয়, বরং জাতিগত পরিচয় ও “জাতীয় প্রতিস্থাপন” আতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত এক ধরনের সভ্যতাগত হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ট্রাম্প বহুবার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন পদক্ষেপ বড় ধরনের সাংবিধানিক সংঘাত তৈরি করবে।
গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গৃহীত ১৪তম সংশোধনী মূলত নাগরিকত্বের অধিকারকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের হাত থেকে সুরক্ষিত করার জন্যই যুক্ত করা হয়েছিল।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, 'আমরাই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে এটি রয়েছে।' তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বকে অভিবাসন আইনের 'অনিচ্ছাকৃত ফাঁকফোকর' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, এটি ব্যাপক অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, এই নীতি মূলত 'দাসদের সন্তানদের' জন্য তৈরি করা হয়েছিল, এবং বর্তমান ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব দাবির এক 'নিয়ন্ত্রণহীন ঢল' তৈরি করতে পারে।
তবে তুলনামূলক আইনি বিশ্লেষণে এই দাবি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে থাকলেও এটি একমাত্র নয়। বিশেষ করে আমেরিকা মহাদেশের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি দেশে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ব্যবস্থা রয়েছে।
বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন হচ্ছে—জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কতটা স্বয়ংক্রিয় হওয়া উচিত এবং যুক্তরাষ্ট্র কি ১৪তম সংশোধনীতে প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক মানদণ্ড সংকুচিত করবে কি না।
এদিকে সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিবাসন মামলা প্রশাসনের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ছাত্র বিক্ষোভকারী, বহিষ্কার প্রক্রিয়া এবং বৈধ বাসিন্দাদের ওপর বাড়তি নজরদারি সংক্রান্ত মামলাগুলো এখন রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, ন্যায়বিচার এবং সাংবিধানিক অধিকারের বৃহত্তর বিতর্কের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন পরিস্থিতি এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং কে দেশে থাকতে পারবে, কে নিরাপদে মত প্রকাশ করতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত কে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী এসব প্রশ্ন ঘিরেও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
সমর্থকদের মতে, এটি বহুদিনের প্রতিশ্রুত কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। তবে সমালোচকদের দৃষ্টিতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব ও অন্তর্ভুক্তির ধারণাকেই নীতিগত চাপ ও সাংবিধানিক সংঘাতের মাধ্যমে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় দ্রুত ছড়াচ্ছে ইবোলা, মৃত্যু বেড়ে ১৭৭