নারী শিক্ষার প্রসারে নবাব সলিমুল্লাহর ঐতিহাসিক ভূমিকা
বাংলাপ্রেস ডেস্ক:
একটি জাতির অগ্রগতির অন্যতম শর্ত শিক্ষা। আর সেই শিক্ষার পরিধি যদি নারীদের পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে বাংলার মুসলিম সমাজ যখন শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থানে নানা সংকটে জর্জরিত, তখন দূরদর্শী নেতৃত্ব নিয়ে এগিয়ে আসেন নবাব সলিমুল্লাহ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নারী ও পুরুষ—উভয়ের শিক্ষার বিস্তার ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শিক্ষায় পিছিয়ে ছিল মুসলিম সমাজ
ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলায় আধুনিক শিক্ষার প্রসার শুরু হলেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে মুসলিম নারীদের শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সীমিত। কুসংস্কার, দারিদ্র্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা এবং রক্ষণশীল সামাজিক মানসিকতা মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথকে কঠিন করে তুলেছিল।
এই বাস্তবতায় নবাব সলিমুল্লাহ শিক্ষাকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিক্ষিত নারীই একটি সচেতন পরিবার ও উন্নত সমাজ গঠনের ভিত্তি।
শিক্ষা বিস্তারে বহুমুখী উদ্যোগ
নবাব সলিমুল্লাহ শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি শিক্ষাবিস্তারে বাস্তব উদ্যোগও গ্রহণ করেন। মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠনে আর্থিক সহায়তা এবং দরিদ্র ও এতিম শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ঢাকায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, পরবর্তীকালে সেটিই সলিমুল্লাহ মুসলিম হল নামে পরিচিতি লাভ করে। একইভাবে এতিম শিশুদের শিক্ষা ও আশ্রয়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত সলিমুল্লাহ এতিমখানাও তাঁর সমাজকল্যাণমূলক চিন্তার প্রতিফলন।
নারী শিক্ষাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা
সে সময় অনেক পরিবার মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনাগ্রহী ছিল। নবাব সলিমুল্লাহ সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আলেম, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মধ্যে নারী শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, শিক্ষিত নারী শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকেই আলোকিত করতে পারেন।
নারীদের জন্য এমন শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষেও তিনি মত দেন, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ভাষা, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সামাজিক জ্ঞান সমান গুরুত্ব পাবে। তাঁর এই চিন্তাধারা সে সময়ের তুলনায় ছিল যথেষ্ট আধুনিক ও দূরদর্শী।
শিক্ষা সংস্কারে ঐতিহাসিক ভূমিকা
মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং মুসলিম সমাজে শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগেও নবাব সলিমুল্লাহ সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করা জরুরি। এ কারণে তিনি আধুনিক পাঠক্রমভিত্তিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন এবং শিক্ষা সংস্কারের নানা উদ্যোগে সহযোগিতা করেন।
দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগের ফলে মুসলিম সমাজে শিক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। নারী শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে এবং মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে নারী শিক্ষা আন্দোলনের জন্য যে সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়, তার পেছনে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
উপসংহার
নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন এমন একজন দূরদর্শী নেতা, যিনি শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারকে একই সূত্রে দেখেছিলেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর চিন্তা, পৃষ্ঠপোষকতা ও বাস্তব উদ্যোগ বাংলার মুসলিম সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং নারী শিক্ষার বিকাশে তাঁর ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
লেখক : প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
বিপি/এসআর
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
জীবন, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের ভাষায় মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের চারটি কবিতা
সঙ্গীত একাডেমি