নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: ভয়াবহ বন্যার কারণে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদী অববাহিকায় বন্যায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া নেপালের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি এখন কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে।
সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট বলছে, নেপালে বর্ষাকাল সাধারণত প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়। ভারী বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত নদীগুলো পানিতে ফুঁসে ওঠেছে। এতে দেশটির নদীভিত্তিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে বিক্রি করতে পারে নেপাল। কিন্তু এবার সেই নদীগুলোই বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যার পর কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে। কারণ, সম্প্রতি ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ নিতে শুরু করা বাংলাদেশে এখন কার্যত বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্ষা মৌসুমে নেপাল গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করত। এখন তা কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে নেপাল। বিশেষ করে শুষ্ক শীতকালীন মাসগুলোতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এমন সময়েই এই সংকট দেখা দিল।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—২২ দশমিক ১ মেগাওয়াটের চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াটের ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে দুটিই বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
চিলিমে প্রকল্প থেকে ভারতকে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলী থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন ছিল। একই সঙ্গে ভারত হয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহেরও অনুমতি ছিল প্রকল্প দুটির। বাংলাদেশে বিক্রি করা বিদ্যুতের মূল্য মার্কিন ডলারে পায় নেপাল।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, ‘বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে অন্য একটি প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতি দিতে আমরা ভারতকে অনুরোধ করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত শূন্য।’
শুধু এই দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বন্যার পর মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
সাঞ্জেন, আপার সাঞ্জেন ও সালাসুঙ্গি প্রকল্পের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ এগুলোকে ‘আইসোলেটেড মোডে’ রেখেছে। এর অর্থ হলো, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডের বাইরে থেকে শুধু আশপাশের এলাকার চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
তবে শুধু বন্যার কারণেই নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি কমে যায়নি। যে সময়ে সাধারণত নেপাল সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ভারতে রপ্তানি করে, তখনও তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারছে না দেশটি। কারণ, ভারত এখনও এসব প্রকল্পের বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন নবায়ন করেনি।
৩৮ দশমিক ৮ মেগাওয়াটের আপার চামেলিয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের রপ্তানি অনুমোদনের মেয়াদ ৩১ জুন শেষ হয়েছে, কিন্তু এখনও তা নবায়ন করা হয়নি। ২৪ দশমিক ২৫ মেগাওয়াটের সেতী রিভার এবং ১০ দশমিক ৭০ মেগাওয়াটের আপার তাদি খোলা প্রকল্পের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩১ জুলাই।
এসব অনুমোদন নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ প্রকল্প তিনটির মোট ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতে বিক্রি করতে পারবে না। এসব অনুমোদন প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়।
ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ আমদানি ও রপ্তানির অনুমোদন দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের বিদ্যুৎ বিদেশে রপ্তানি করতে হলে নেপালকে আগে এই অনুমোদন নিতে বা নবায়ন করতে হয়।
বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করলেও নেপালকে কী ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে, এই পরিস্থিতি তারই উদাহরণ। এখন পর্যন্ত নেপালের ৩৭টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে ভারত। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। চিলিমে ও ত্রিশূলীও এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে।
কাঠমান্ডু পোস্ট বলছে, বর্ষাকালে নদীতে প্রচুর পানি থাকায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। সেই বিদ্যুৎ রপ্তানি করা হয়। আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ কমে গেলে এবং দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলে নেপাল ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে।
নেপাল যখন সাধারণত সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ রপ্তানি করে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করে, ঠিক সেই সময়েই ভোতেকোশির বন্যা এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
এখন ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো সচল করার চেষ্টা করছে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি অন্য সচল প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য ভারতের অনুমোদন পাওয়ারও চেষ্টা করছে দেশটি।
বিপি/কেজে
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি