নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে মার্কিন সিনেটের লড়াইয়ে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী কারিশমা মানজুর
চিকিৎসাবিজ্ঞানী বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ড. কারিশমা মানজুর
নোমান সাবিত: চিকিৎসাবিজ্ঞানী, অলাভজনক সংস্থার নেত্রী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মী বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ড. কারিশমা মানজুর নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দুই দশকেরও বেশি সময়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণা এবং দীর্ঘদিনের নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ২০২৬ সালের নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন।
এক্সেটারের বাসিন্দা মানজুর জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, নির্বাচনী অর্থায়ন সংস্কার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া পররাষ্ট্রনীতিকে তাঁর প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০২৬ সালের জুনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সিনেট নির্বাচনের প্রার্থিতা দাখিল করেন।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর। দলটির মনোনয়ন পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন একাধিক প্রার্থী, যাদের মধ্যে মানজুরও রয়েছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে জনসেবায়
কারিশমা মানজুর বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজিতে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণায় তাঁর দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে মৃগীরোগ ও বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন স্নায়ুবিক ও মানসিক রোগ নিয়ে গবেষণায় তিনি যুক্ত ছিলেন।
তাঁর প্রচারাভিযানের দেওয়া জীবনী অনুযায়ী, মানজুর ১৯৯১ সালে কেমব্রিজ স্কুল অব ওয়েস্টন থেকে স্নাতক হন। ১৯৯৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার থেকে নিউরোসায়েন্সে বিএস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০০৪ সালে আইকান স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাই থেকে বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
তাঁর পেশাগত কাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল নিউরোলজি, মৃগীরোগ এবং সাইকিয়াট্রিক ফার্মাকোলজি-সংক্রান্ত গবেষণা ও মেডিকেল রাইটিং। তাঁর প্রচারাভিযানের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সংশ্লিষ্ট গবেষণাকাজ এপিলেপসি অ্যান্ড বিহেভিয়ার, ব্রেইন অ্যান্ড বিহেভিয়ার, এপিলেপসিয়া, বিএমজে-এর বিভিন্ন জার্নাল এবং আমেরিকান জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রিসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে।
বিজ্ঞানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তিনি নাগরিক ও অলাভজনক সংগঠনের কার্যক্রমেও যুক্ত। তিনি নিউ হ্যাম্পশায়ার র্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং এবং নিউ হ্যাম্পশায়ার ওপেন ডেমোক্রেসি অ্যাকশনের সঙ্গে নেতৃত্ব পর্যায়ে কাজ করেছেন এবং এর আগে নিউ হ্যাম্পশায়ার পিস অ্যাকশনের বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এসব সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার তথ্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে।
শান্তি ও তৃণমূল আন্দোলনে সক্রিয়
গণতান্ত্রিক সংস্কার, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শান্তির পক্ষে বিভিন্ন তৃণমূল উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন মানজুর।
এক্সেটারে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নাগরিক উদ্যোগেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর প্রচারাভিযানের তথ্য অনুযায়ী, তিনি উত্তেজনা প্রশমন ও দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজায় অবিলম্বে মানবিক সহায়তা প্রবেশের দাবিসংবলিত প্রস্তাব এগিয়ে নিতে কাজ করেন।
প্রচারাভিযানের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এক্সেটারে সামরিক বাজেট সংস্কার, গাজায় মানবিক সহায়তা, নির্বাচনী অর্থায়ন সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঁচটি ব্যালট প্রস্তাব এগিয়ে নিতেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
র্যাঙ্কড-চয়েস ভোটিং এবং শ্রমিক সংগঠন শক্তিশালী করার পক্ষেও তিনি সক্রিয়। বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের সামনেও তিনি বক্তব্য দিয়েছেন।
রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাব কমানোর অঙ্গীকার
নিজেকে প্রগতিশীল প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করা মানজুরের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে রাজনীতিতে বড় করপোরেট ও বিশেষ স্বার্থের অর্থের প্রভাব কমানো।
তাঁর প্রচারাভিযান জানিয়েছে, তিনি করপোরেট পিএসি থেকে অর্থ গ্রহণ করেন না। ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তাঁর প্রচারাভিযানে মোট প্রাপ্তি ছিল দুই লাখ ছয় হাজার ডলারের বেশি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত অনুদান ছিল এক লাখ ৮১ হাজার ডলারের বেশি এবং প্রার্থীর নিজের দেওয়া ঋণ ছিল ২৫ হাজার ডলার।
সিনেটর নির্বাচিত হলে রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাব কমানো, সাশ্রয়ী আবাসন বৃদ্ধি, সর্বজনীন শিশুযত্ন ব্যবস্থা, Medicare for All-সহ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং মানবিক ও কূটনীতিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে করপোরেট পিএসি, ডার্ক মানি এবং বাইরের বিশেষ স্বার্থের অর্থের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও তুলেছেন মানজুর।
নিজের বৈজ্ঞানিক পটভূমিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সরকারি নীতি হওয়া উচিত তথ্য-প্রমাণ ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে।
তাঁর প্রচারাভিযানের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত হলে কারিশমা মানজুর হবেন বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ে পিএইচডিধারী প্রথম নারী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দায়িত্ব পালন করবেন।
দুই দশকের বেশি সময়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণা, অলাভজনক সংগঠনের নেতৃত্ব এবং তৃণমূল নাগরিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে এবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভূমিকায় নিয়ে যেতে চাইছেন কারিশমা মানজুর। আগামী সেপ্টেম্বরে নিউ হ্যাম্পশায়ারের ভোটাররা সেই রাজনৈতিক যাত্রার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবেন।
কারিশমা মানজুরের নির্বাচনী প্রচারের ওয়েবসাইট।
উল্লেখ্য, কারিশমা মানজুর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন কিংবদন্তি সেক্টর কমান্ডার, একনিষ্ঠ সেনানায়ক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ সামরিক কর্মকর্ তামেজর জেনারেল মুহম্মদ আবুল মঞ্জুরের মেয়ে। তার বাবা ১৯৭১ সালে তিনি ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এই মেধাবী কর্মকর্তার বিতর্কিত ও মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
আগামী মঙ্গলবার (২৫ আগষ্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৮টায় নিউ ইংল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশিরা তার নির্বাচনী প্রচারণার তহবিল সংগ্রহের জন্য একটি ভার্চুয়াল সভার আয়োজন করেছেন।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি