নিউ ইয়র্কে গ্রিন কার্ড পেতে ভুয়া বিয়ে: প্রতারণা চক্রের ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা
নিউ ইয়র্কে গ্রিন কার্ড পেতে ভুয়া বিয়ে
নোমান সাবিত: এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ১,০০০টির বেশি ভুয়া বিয়ের আয়োজন করে বিদেশি নাগরিকদের—বিশেষ করে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের নাগরিকদের—প্রতারণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে দুই দফা অভিযোগপত্র আজ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রতিটি ভুয়া বিয়ের জন্য কেউ কেউ ১ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করেছেন।
মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, “এই বিচার বিভাগ আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থাসহ সর্বত্র প্রতারণা নির্মূল করছে। আজ যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা বিদেশি নাগরিকদের ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য জটিল প্রতারণামূলক পরিকল্পনা পরিচালনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের আইনের প্রতি সরাসরি অবমাননা এবং ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই সহ্য করবে না।”
নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের মার্কিন অ্যাটর্নি জেমি ম্যাকডোনাল্ড বলেন, “অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা ও তাদের সহযোগীরা দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু মিলিয়ন ডলারের একটি বিয়ে-সংক্রান্ত প্রতারণা চক্র পরিচালনা করেছিল। নিজেদের আর্থিক লাভের জন্য তারা অংশগ্রহণকারীদের ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনকে অপব্যবহার করেছে। আজকের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অভিযোগ আনা সবচেয়ে বড় ভুয়া বিয়ের প্রতারণা চক্রগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই মামলা প্রমাণ করে যে, আমাদের আইন প্রয়োগকারী অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে আমরা দেশের বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপব্যবহার করতে চাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেব।”
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা (USCIS)-এর পরিচালক জোসেফ বি. এডলো বলেন, “যারা মিথ্যা, প্রতারণা বা চুরির মাধ্যমে বৈধ অভিবাসন মর্যাদা অর্জন করতে চায়, তারা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। ইউএসসিআইএস বিয়ে-ভিত্তিক প্রতারণার চক্র এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে লাভবান অপরাধী সংগঠন ও মূল হোতাদের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা প্রতারণা উন্মোচন, আইনের শাসন রক্ষা এবং প্রকৃতপক্ষে যোগ্য ব্যক্তিদের জন্যই অভিবাসন মর্যাদা নিশ্চিত করার কাজ অব্যাহত রাখব।”
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের (HSI) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর জন কনডন বলেন, “অভিযোগ অনুযায়ী, এক দশক ধরে চলা এই চক্র বিয়ে-সংক্রান্ত প্রতারণাকে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত করেছিল। তারা অসংখ্য ভুয়া বিয়ের আয়োজন করে এবং ইউএসসিআইএসে শত শত জাল গ্রিন কার্ডের আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে এইচএসআই ও আমাদের অংশীদাররা আইনের শাসনকে দুর্বল করে, ফেডারেল আইনকে অপব্যবহার করে এবং প্রতারণার মাধ্যমে লাভবান হওয়া অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোকে ভেঙে দেওয়া অব্যাহত রাখবে।”
আসামিদের আজ সকালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের আজই আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। আসামিরা হলেন:
- অ্যামি চেং, ওরফে “অ্যামি ঝৌ”, ৭২, ব্রুকলিন, নিউইয়র্ক;
- শিয়াও মেই চ্যান, ওরফে “কারমেন”, ৬৪, কুইন্স, নিউইয়র্ক;
- ক্রিস্টিন লু, ওরফে “লিলি”, ৫২, কুইন্স;
- জিং ইয়ান ইয়ে, ওরফে “সেরিন”, ৪৩, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক;
- শিয়াও ইয়ান চেন, ওরফে “অ্যানা”, ৪৮, ব্রুকলিন;
- গ্যাং ঝেং, ওরফে “মাইকেল” ও “মাইক”, ৬১, কুইন্স;
- অ্যান্থনি চেং, ৪৭, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড;
- মিশেল দুএনাস, ৩৫, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড;
- অ্যাঞ্জেলা দুএনাস, ২৬, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড;
- সিগ্রিড সেটিনো, ৩২, পিকস্কিল, নিউইয়র্ক; এবং
- এরিকা জনসন, ৪৩, অসিনিং, নিউইয়র্ক।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, অন্তত ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আসামিরা দেশজুড়ে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বিয়ে-ভিত্তিক প্রতারণা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। এই চক্র বিদেশি নাগরিক—বিশেষ করে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের নাগরিকদের—সঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের ভুয়া বিয়ের ব্যবস্থা করত।
মূলত নিউইয়র্ক সিটিকেন্দ্রিক হলেও চক্রটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও বিদেশে ভুয়া বিয়ের আয়োজন করত। এর মধ্যে ছিল কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, পেনসিলভানিয়া, কেনটাকি, টেনেসি, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, ভানুয়াতু এবং চীন।
এই নেটওয়ার্কে বিভিন্ন পর্যায়ের সহযোগী ছিল। কেউ চক্রটি পরিচালনা করত এবং বিদেশি নাগরিকদের গ্রাহক হিসেবে শনাক্ত করত। কেউ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের খুঁজে বের করে তাদের ভুয়া বিয়েতে অংশ নিতে রাজি করাত এবং তাদের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করত। অন্যরা অভিবাসন-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি এবং ইউএসসিআইএসে জাল বৈধ স্থায়ী বসবাসের (গ্রিন কার্ড) আবেদন জমা দেওয়ার সমন্বয় করত।
এছাড়া বিয়ের কর্মকর্তা, আইনজীবী, কর প্রস্তুতকারী, বিমা প্রদানকারীসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারীও এই চক্রের কাজে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকরা ভুয়া বিয়ে এবং বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পাওয়ার সহায়তার জন্য মধ্যস্থতাকারীদের সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতেন। মধ্যস্থতাকারীরা অংশগ্রহণকারী মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত দিতেন। সাধারণত গ্রিন কার্ড আবেদনের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে মিল রেখে কিস্তিতে এই অর্থ দেওয়া হতো। এছাড়া প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে চক্রে যুক্ত করার জন্য নিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত কমিশন দেওয়া হতো।
সব মিলিয়ে আসামি ও তাদের সহযোগীরা শত শত মার্কিন নাগরিককে ভুয়া বিয়েতে অংশ নিতে নিয়োগ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের জুটি তৈরি করে এই প্রতারণা কার্যকর করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের লাইসেন্স নেওয়ার ঠিক আগে পর্যন্ত ওই দুই ব্যক্তি একে অপরের সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা করতেন। এরপর ভুয়া বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো এবং বিয়েগুলোকে বাস্তব বলে মনে করানোর জন্য সাজানো ছবি তোলা হতো। এমনকি চীনেও একটি ভুয়া বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও বিয়েগুলো বাস্তব বলে প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের জাল প্রমাণ তৈরি করা হতো। এর মধ্যে ছিল অতিরিক্ত ছবি তোলা, যৌথ ব্যাংক ও ইউটিলিটি অ্যাকাউন্ট খোলা, যৌথভাবে কর রিটার্ন জমা দেওয়া এবং বিমা পলিসি গ্রহণ করা।
এরপর আসামি ও তাদের সহযোগীরা গুরুত্বপূর্ণ মিথ্যা তথ্যসহ গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রস্তুত করে ইউএসসিআইএসে জমা দিতেন। ইউএসসিআইএসের সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন হলে ভুয়া বিয়েতে অংশগ্রহণকারীদের কীভাবে তাদের প্রকৃত সম্পর্কের বিষয়টি গোপন করতে হবে এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের কীভাবে মিথ্যা উত্তর দিতে হবে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
আসামিরা অন্তত শত শত জাল গ্রিন কার্ডের আবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি ইউএসসিআইএসে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রটির ব্যাপকতা ও দীর্ঘস্থায়ী কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পেতে আগ্রহী বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা কয়েক কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে।
আসামিদের গ্রেপ্তারের সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিউইয়র্কের একাধিক স্থানে তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করে। এসব স্থানের মধ্যে ব্রুকলিনের সানসেট পার্ক এবং কুইন্সের ফ্লাশিংও রয়েছে।
প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে বিয়ে ও অভিবাসন-সংক্রান্ত প্রতারণার ষড়যন্ত্রের একটি অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে এই অভিযোগে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের অবৈধভাবে বসবাসে উৎসাহিত করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। এই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এই মামলার তদন্ত করছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের হাডসন ভ্যালি ইউনিট, এফবিআইয়ের সেফ স্ট্রিটস টাস্ক ফোর্স, ইউএসসিআইএসের ফ্রড ডিটেকশন অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেট, ইউএস আর্মি ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন এবং ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়।
নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নি জেক সিড্রানস্কি ও রেহান ওয়াটসন মামলাটি পরিচালনা করছেন।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি