সৈয়দপুরের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এনজিওর শিক্ষা কার্যক্রম
এম আর আলী টুটুল, সৈয়দপুর (নীলফামারী )প্রতিনিধি : সৈয়দপুরে স্কুলের নামে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিভিন্ন এনজিও । শিক্ষা ,স্বাস্থ্য ও অনুদান সহায়তা প্রদানের কথা বলে বিদেশি দাতাদের আর্থিক অনুদান নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এ সমস্ত কার্যক্রম ।দুস্থ অসহায়দের পুঁজি করে কিছু এনজিও হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি অর্থ ।
এনজিও শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ৮ বছর থেকে ১৪ বছরের সুবিধা বঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের জন্য শিক্ষা দেওয়া । প্রাক প্রাথমিক স্কুল তৈরি করে শিশুদের মূল ধারার শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা ।এই কার্যক্রম গুলো সরকারি নীতির পক্ষে সমর্থন করে এবং সকলের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখে । ষাটের দশকের পূর্ব পর্যন্ত উন্নয়নের অর্থ ছিল 'মানবসম্পদ উন্নয়ন ' অর্থাৎ মানুষকে একটি সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য । মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলী , সদিচ্ছা , ভালোলাগা - মন্দলাগা এসবের কথা না ভেবে মানুষকে কেবল একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য ।
ষাটের দশকের পরে উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে মানবসম্পদ উন্নয়নের ধারণা পরিবর্তিত হয়ে প্রচলন হয় মানব উন্নয়ন ধারণার । কিন্তু বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন ধারণার ছোঁয়া লাগতে আরো অনেক সময় লেগে যায় ।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তর এনজিও সমূহ কাজ শুরু করে মূলত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য । পাশাপাশি দারিদ্র বিমোচনের জন্য হাতে নেয় বিভিন্ন ধরনের আয়বর্ধক কর্মসূচি । এ সময় অন্য অনেক কাজের মাঝে এনজিওর অবদান হিসেবে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ পরবর্তী ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের ঋণ কর্মসূচির প্রাধান্য ছিল বেশি ।ওই সময় এনজিও সমূহ কিছু কিছু উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পদক্ষেপ নিলেও এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জীবন দক্ষতা উন্নয়নের জন্য মৌলিক শিক্ষাকে ভীত হিসেবে কাজে লাগানো । সে সময় ধারণা করা হতো মানুষকে সম্পদের রূপান্তরিত করতে পারলে বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও ক্ষুধা মুক্ত হবে, অর্থাৎ স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে ।শুরুর দিকে সে ধারণাকে সামনে রেখে কাজ করে গেছে , পরে বিশ্বের সাথে এদেশেও ধারণা পাল্টিয়ে জীবন দক্ষতার উন্নয়ন করে পিছিয়ে পড়া জলগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহ ও মানবতার বিকাশ সাধন করা অসম্ভব । এতে সমাজের সমতাভিত্তিক স্থায়ী বা টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় বা হতে থাকে ।
আশির দশকের শেষার্ধে এসে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষা বিষয়টিকে বেছে নেওয়া হয় । কেননা মানুষের সার্বিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই গুণগত শিক্ষা । বাংলাদেশের অনেক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও শিশুর শৈশবকালীন বিকাশ কর্মসূচি সহ মূল ধারার শিক্ষাকে সহায়তা করার জন্য নানামুখী কর্মসূচি নিতে থাকে ।
ধারণা করা হতো শিক্ষার সুযোগ লাভের অধিকার ছিল বিশেষ শ্রেণীর মানুষদের , দরিদ্র বা সামাজিকভাবে নিচু শ্রেণীর নয় । এমন একটি অস্থিতিশীল ও অব্যবস্থাপনাগত পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা । এসব এনজিও সমাজের অপেক্ষা কৃত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি শিশু অধিকার , মানব অধিকার , নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে ।
বর্তমানে সৈয়দপুরে বেশ কয়েকটি এনজিও সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম বেছে নিয়েছে বিদেশি দাতাদের অনুদানের অর্থে শিশুদের বই , শিখা উপকরণ ও অভিভাবকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের শিক্ষা কেন্দ্রে আসার উৎসাহিত করছে । এতে ঝরে পড়া শিশু উল্লেখ থাকলেও সরকারি প্রাইমারি শিক্ষা অফিসের জরিপকৃত শিশুদের , যারা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষানিতে আগ্রহী তাদের নিরুৎসাহিত করছে । এতে করে প্রাইমারি স্কুলে শিশুদের উপস্থিতির হার কমে যাচ্ছে । ব্রাক প্রথমদিকে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এখন অনেক এনজিও সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে নিজেদের মতো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পরিচালনা করছে ।
সরকারিভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য বই ,শিক্ষা উপবৃত্তি ,টিফিন সহ শিক্ষা উপকরণ এবং দূরের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল বিতরণ করছে । চিকিৎসার জন্য বিদ্যালয় স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু রয়েছে । আনন্দদায়ক পাঠদানের জন্য রয়েছে ডিজিটাল ক্লাসরুম , ল্যাপটপ ,প্রজেক্টর , মাল্টিমিডিয়া সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদি। চার বছরের উপরের শিশুদের জন্য রয়েছে প্রি প্রাইমারি এবং পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ।
সরকারি সব সহায়তার পরেও সৈয়দপুরে কিছু এনজিও দাতাদের ভুল তথ্য দিয়ে সুবিধা বঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ।
শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় সৈয়দপুরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে মোট সাতটি এনজিও । একটি স্কুলের জন্য একটি কোড নম্বর দিয়ে বই দেওয়া হয় , কিন্তু কিছু এনজিও একটি কোড নম্বর ব্যবহার করে একাধিক স্কুল পরিচালনা করছে । প্রাইমারি ক্লাসটার ২ কিলো এরিয়ার মধ্যে কোন এনজিও স্কুল পরিচালনা করতে পারবেনা পরিপত্র থাকলেও মানা হচ্ছে না কোন নিয়ম । আবাসিক বহুতল ভবন ভাড়ায় নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ।সেখানে নিয়মিত সমাবেশ করার মতো পরিবেশও নেই । ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় একটি করে ঘর ভাড়া নিয়ে তিনটি ক্লাস মিলে একটি স্কুল , আবার একটি ঘরে একটি ক্লাস হয় সেটাকেও একটি স্কুল হিসেবে গণনায় ধরছে । এভাবে দাতাদের দেখাচ্ছে শুধু সৈয়দপুরেই ২০ঃ৩০ টা স্কুল । সরকার বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা চালু রেখেছে কিন্তু ওই সব স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে দেড় থেকে ২শ টাকা বেতন নিচ্ছে । আবার অফার দিয়েছে একই পরিবারের দুইজন ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে ।
সবমিলিয়ে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে ওইসব এনজিওর শিক্ষা কার্যক্রম । সৈয়দপুরের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের যোগসাজেসে এনজিওগুলো সরকারি বিনামূল্যে বিতরণের বই পেয়ে যাচ্ছে । ক্লাস্টার এলাকার দুই কিলোর মধ্যে এনজিও গুলো স্কুল পরিচালনা করলেও শিক্ষা অফিস থেকে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকরী কোন ব্যবস্থা । ফলে দিন দিন এনজিও গুলোর এ ধরনের স্কুল বেড়েই চলেছে । শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এর ভিন্নতা । বিভিন্ন এনজিএ স্কুল পরিচালনা করছে কিন্তু এর কোন তথ্য নেই শিক্ষা অফিসে । তারা সৈয়দপুর উপজেলায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও উদ্দেশ্য প্রণোদিত এই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শিক্ষা অফিস থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষার্থীর এক অভিভাবক আনোয়ারুল হক রন জানান আগের চেয়ে সরকারি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষার মান অনেক ভালো। তবে এনজিও গুলো সরকারের শিক্ষা কায্যক্র'ম প্রশ্নবৃদ্ধ করছে।
এব্যাপারে সৈয়দপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শফিকুল আলম জানান সরকারের অনুমতি থাকায় পূর্বের শিক্ষা অফিসার বই সরবরাহ করেছেন । আমাদের তালিকার বাইরে কোন স্কুল থাকলে তা অবগত নন । এনজিওর শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান এ ব্যাপারে এনজিওদের কাছে থেকে বক্তব্য নেবেন । এ ব্যাপারে আমার কোন বক্তব্য নেই ।
নীলফামারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কুমারেস চন্দ গাছী জানান সরকারি নিতি মালায় ৮ বছর থেকে ১8 বছরের ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে তারা শিক্ষাকায্য'ক্রম চালাতে পারে , কিন্তু ৫ বছরের শিশুদের নিয়ে এই শিক্ষাকায্যক্র'ম চালাচ্ছে এনজিওগুলো। শিক্ষাথ'ীদের কাছ থেকে বেতনও নিচ্ছেে । এই অনুমোদন সরকার তাদের দেয়নি। এদের স্কুুল বলা যাবে না। আমরা এবাাপারে যথাযথ ব্যবস্হা গ্রহণ করবো।
বিপি>আর এল
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
শিক্ষার্থীরা বাংলা-ইংরেজি রিডিং না পারলে শিক্ষকের বেতন বন্ধের সিদ্ধান্ত
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি