৫ অক্টোবর ২০২৬

সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাপ্রেস ডেস্ক:  দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে দেশব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থায় মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে সরকারি ভবন থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারের ভবনের ছাদগুলোতেও সৌর বিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 সৌরবিদ্যুৎ খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কেবল ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা ও আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এ পরিস্থিতিতে দেশীয়ভাবে সহজলভ্য সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।

তিনি বলেন,  বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (স্রেডা) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ইতোমধ্যে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে। এর বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎ।

ফলে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণেও সৌরশক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রুফটপ সোলারব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে অতিরিক্ত জমি ব্যবহার ছাড়াই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। নেট মিটারিংয়ের সুবিধা আরো বিস্তৃত করার মাধ্যমে গ্রাহকদেরও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পৃক্ত করা হবে। সরকারের সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ। 

মোজাফফর আহমেদ আরো বলেন, ২০২৫ সালে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনার ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কর্মসূচির মাধ্যমে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নতুন করে বড় পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমবে এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট ভবন বা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। স্রেডার নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনে সফলতা পেয়েছে। 

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নির্ভরযোগ্যভাবে যুক্ত করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সরকারি পরিকল্পনায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হওয়ায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরকে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, নীতিগত সুবিধা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা, দ্রুত অনুমোদন, সহজ গ্রিড সংযোগ এবং অর্থায়নের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে আরও বড় বিনিয়োগ আসতে পারে। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সূর্যের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে দিনের বিভিন্ন সময়ে উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তন ঘটে।

তিনি আরো বলেন, সন্ধ্যা ও রাতে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন কমে যায়। এ কারণে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নও জরুরি হয়ে উঠছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর বাইরে গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয়, এমন সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থার সক্ষমতা ৩৭৭ দশমিক ১৭ মেগাওয়াট। সর্বমোট দেশে সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট। 

আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিও এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখবে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান  বলেন, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় গ্রিড ব্যবস্থাপনায় নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। 

তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে বড় পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হলে আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আর এজন্য ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো বলেন, দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত অংশ সংরক্ষণ করে, সন্ধ্যা বা রাতে তা ব্যবহার করা গেলে সৌরবিদ্যুতের কার্যকারিতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

আবদুর রশিদ খান বলেন, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিজমি রক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। ফলে পতিত ও অনুপযোগী জমি, বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে জলাশয়ভিত্তিক বা ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, গ্রামীন অর্থনীতিতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেচ পাম্প, ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, ঠান্ডা সংরক্ষণাগার, হাঁস-মুরগি ও মাছের খামারসহ বিভিন্ন কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের বিকল্প উৎস তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো তুলনামূলক দুর্বল, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দেন তিনি।  সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন, ব্যাটারি স্টোরেজ, বিতরণ ব্যবস্থা ও আধুনিক গ্রিড প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ করতে হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখন থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি রুফটপ সোলার, নেট মিটারিং, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ই হতে পারে এ পরিকল্পনার মূল ভিত্তি।
বিপি>টিডি

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি