১৩ আগস্ট ২০২৬

ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারির পদত্যাগ, আসল কারণ কী?

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারির পদত্যাগ, আসল কারণ কী?

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট।

বাংলাপ্রেস ডেস্ক:  চলতি আগস্ট মাসের শেষের দিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন ক্যারোলিন লেভিট। বুধবার (১২ আগস্ট) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে ট্রাম্প তার অন্যতম বিশ্বস্ত উপদেষ্টাকে হারাতে যাচ্ছেন।

তবে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব ছাড়লেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয় থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছেন না ২৮ বছর বয়সী লেভিট। ট্রাম্প ও লেভিট—দুজনের পক্ষ থেকে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি হোয়াইট হাউসের বাইরে থেকে যোগাযোগ উপদেষ্টা (এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস অ্যাডভাইজার) হিসেবে কাজ করবেন। পাশাপাশি ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে দলীয় সংগঠক হিসেবেও ভূমিকা রাখবেন।

সন্তানকে সময় দিতেই কি সরে দাঁড়ানো?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় লেভিট জানিয়েছেন, তিনি তার শিশুদের আরও বেশি সময় দিতে চান। গত মে মাসে তিনি একটি কন্যাসন্তানের মা হয়েছেন। সম্প্রতি মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে আবারও দায়িত্বে ফিরেছিলেন তিনি।

লেভিটের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারকে আরও সময় দেওয়ার ইচ্ছাই তার দায়িত্ব ছাড়ার অন্যতম কারণ। তবে তার পদত্যাগের সময়কাল ও সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কের কারণে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও লেভিটের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি লিখেছেন, ২০১৮ সাল থেকে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মুক্ত চিন্তার পক্ষে লড়াইয়ে ক্যারোলিন হোয়াইট হাউসে একজন প্রকৃত নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায়ও তার ভূমিকার প্রশংসা করেন ট্রাম্প।

লেভিটকে তিনি ‘হোয়াইট হাউসের ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রেস সেক্রেটারি’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনের সময়টিকে নিজের ‘জীবনের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন লেভিট।

হোয়াইট হাউসের সর্বকনিষ্ঠ প্রেস সেক্রেটারি

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হওয়ার আগে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারণায় যুক্ত হন লেভিট। পরে তিনি ট্রাম্পের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মার্কিন ইতিহাসে হোয়াইট হাউসের সর্বকনিষ্ঠ প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

প্রায় দেড় বছরের দায়িত্ব পালনের সময়ে লেভিট এবং হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং প্রশাসনের যোগাযোগনীতি ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। ট্রাম্পের মিত্ররা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও মুক্ত সংবাদমাধ্যমের সমর্থকেরা এর তীব্র সমালোচনা করেন।

প্রথাগত রীতি ভেঙে ট্রাম্প প্রশাসন প্রেসিডেন্টের কাছে কোন কোন সাংবাদিক সরাসরি পৌঁছাতে পারবেন, সে বিষয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে। এর ফলে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী ‘প্রেস পুল’ ব্যবস্থা থেকে প্রশাসন অনেকটাই সরে আসে।

মূলত ছোটখাটো ইভেন্টে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই প্রেস পুল ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু ছিল।

নতুন গণমাধ্যমকে বাড়তি গুরুত্ব

এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রেস অফিস ব্রিফিং রুমে গণমাধ্যমের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আসন বরাদ্দ করে। এর ফলে পডকাস্ট, নিউজলেটার এবং নতুন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমগুলো প্রেসিডেন্টের কার্যক্রম কাভার করার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

বিষয়টিকে কেউ কেউ ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন এই সুযোগকে তাদের অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোকে পুরস্কৃত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এ নিয়ে বিতর্ক চলার মধ্যেই এবার দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিলেন লেভিট।

বিতর্কের মধ্যেই পদত্যাগের ঘোষণা

লেভিটের পদত্যাগের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত জুলাইয়ে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভার সদস্য, কর্মী এবং সাংবাদিকদের বহনকারী একটি বিমানকে এক ধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার হুমকির মুখে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ট্রাম্পকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের পেছনের অংশে লুকিয়ে একটি বিমান থেকে গোপনে অন্য একটি বিমানে—সি-৩২—স্থানান্তর করে।

তবে মূল বিমানে থাকা সাংবাদিক ও অন্যান্য যাত্রীরা তখন বিষয়টি জানতে পারেননি।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন প্রকাশের পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিদেশ সফর ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি ও নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের কেউ কেউ বলেন, ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা থেকে প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হলেও একই বিমানে থাকা অন্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তাহলে লেভিটের পদত্যাগের সঙ্গে বিমান বিতর্কের সম্পর্ক কী?

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— তুরস্ক থেকে ফেরার পথে ট্রাম্পকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এবং ক্যারোলিন লেভিটের পদত্যাগের মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে?

এখন পর্যন্ত লেভিটের পদত্যাগের সঙ্গে ওই ঘটনার সরাসরি কোনো সম্পর্কের প্রমাণ নেই। লেভিট নিজেও তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে সন্তানদের আরও বেশি সময় দেওয়ার বিষয়টিই সামনে এনেছেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম মহলে জল্পনা রয়েছে।

অনেকের মতে, তুরস্কের বিমানসংক্রান্ত ঘটনাটি অত্যন্ত গোপনীয় ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে চলে আসায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হয়ে থাকতে পারেন। যেহেতু হোয়াইট হাউসের সংবাদ ব্রিফিং ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি লেভিটের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, তাই ঘটনাটি কীভাবে সংবাদমাধ্যমে পৌঁছাল—তা নিয়ে তার ওপরও প্রশ্ন বা চাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

তবে লেভিটের পদত্যাগের পেছনে এই বিতর্কই মূল কারণ—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

ক্যারোলিন লেভিটের দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ সামনে এলেও তার পদত্যাগের সময়কাল এবং সাম্প্রতিক গণমাধ্যম বিতর্ককে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছে।

তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, হোয়াইট হাউসের ভেতরের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিসর থেকে লেভিট পুরোপুরি বিদায় নিচ্ছেন না। বরং বাইরে থেকে যোগাযোগ উপদেষ্টা ও মাগা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে তার ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।

ফলে এটি ট্রাম্প শিবির থেকে লেভিটের সম্পূর্ণ বিদায় নয়; বরং হোয়াইট হাউসের ভেতরের দায়িত্ব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের এক নতুন ভূমিকায় তার রূপান্তর। সূত্র: রয়টার্স

বিপি>টিডি

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি