৭ জুলাই ২০২৬

ভরা মৌসুমেও মিলছে না রুপালি ইলিশ

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
ভরা মৌসুমেও মিলছে না রুপালি ইলিশ

বাংলাপ্রেস ডেস্ক: ভরা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রধান ইলিশ উৎপাদনকারী অঞ্চল—ভোলা, চাঁদপুর ও বরগুনায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। নদ-নদী ও মোহনায় জাল ফেলে খালি হাতে ফিরছেন লাখো জেলে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে, অন্যদিকে জেলেরাও পড়েছেন চরম ঋণগ্রস্ত অবস্থায়।

ভোলা: ভোলার ঘাটে মাছের বদলে হাহাকার: ইলিশের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ভোলায় ভরা মৌসুমেও মাছের আকাল চলছে। তেঁতুলিয়া ও মেঘনা নদীতে জাল ফেলে জেলেরা ইলিশের বদলে পাচ্ছেন কেবল কচুরিপানা বা ছোট প্রজাতির মাছ।

পরিস্থিতি: স্থানীয় আড়তদারদের ভাষ্যমতে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবছর ঘাটে ইলিশের সরবরাহ অন্তত ৬০-৭০ শতাংশ কম।

প্রভাব: জ্বালানি খরচ তুলে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ায় অনেক জেলেই নৌকা সাগরে বা নদীতে নামানো বন্ধ করে দিয়েছেন। পরিবার চালাতে না পেরে অনেকেই এখন পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।

চাঁদপুর: ইলিশের বাড়িতে ইলিশের সংকট: চাঁদপুরের মেঘনা ও পদ্মা নদীর মোহনায় যে ইলিশের সমারোহ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই নীরবতা। ইলিশের জন্য বিখ্যাত চাঁদপুরের মাছের বাজারে চাহিদার তুলনায় ইলিশের আমদানি নেই বললেই চলে।

মূল কারণ: মৎস্য গবেষকদের মতে, নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া (নাব্য সংকট) এবং পানির দূষণ ইলিশের স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত করছে। এছাড়া প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনের ফলে ইলিশের প্রজনন চক্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বাজার চিত্র: সরবরাহ কম থাকায় চাঁদপুরে ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।

বরগুনা: সাগরেও ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ: বরগুনার পায়রা ও বিষখালী নদী এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলে মাছ ধরা ট্রলারগুলো এখন ঘাটে অলস বসে আছে। সমুদ্রগামী জেলেরা বলছেন, সাগরে জাল ফেলেও ইলিশের বড় ঝাঁক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ঝুঁকি: সাগরে লঘুচাপ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ট্রলারগুলো অনেক সময় তীরে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন মহাজন ও ট্রলার মালিকরা।

জীবনযাত্রা: বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আসার কথা ছিল, তা না আসায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার ঘাট শ্রমিক।

ভোলা, চাঁদপুর ও বরগুনা—এই তিন জেলাকে ঘিরে আমাদের দেশের ইলিশ অর্থনীতির সিংহভাগ আবর্তিত হয়। মৎস্য জীববিজ্ঞানীদের মতে, ইলিশ মাছের জীবনচক্র অত্যন্ত সংবেদনশীল। বর্তমানের পরিস্থিতি এর ওপর সরাসরি আঘাত হানছে:

তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার ভারসাম্যহীনতা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগরের তলদেশের তাপমাত্রা বাড়ছে। ইলিশ নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পানিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে ইলিশের প্রচলিত বিচরণপথ পরিবর্তিত হয়ে গভীর সমুদ্রের দিকে চলে যাচ্ছে, যা উপকূলীয় জেলেদের নাগালের বাইরে।

নদীর নাব্য সংকট ও ডুবোচর: চাঁদপুরের মোহনা থেকে ভোলার উপকূল পর্যন্ত মেঘনা-পদ্মা অববাহিকায় প্রচুর পরিমাণে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে গেছে। ইলিশ স্রোতস্বিনী ও গভীর পানি পছন্দ করে। ডুবোচরের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

শিল্প ও নৌ-দূষণ: নদ-নদীতে শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং লঞ্চ ও ট্রলারের অতিরিক্ত শব্দ ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইলিশ অত্যন্ত শব্দ-সংবেদনশীল মাছ, অতিরিক্ত শব্দে তারা এলাকা ত্যাগ করে।

প্রভাবশালী সিন্ডিকেট: মৎস্য আহরণ মৌসুমে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় নিষিদ্ধ জাল (যেমন—কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল) ব্যবহারের ফলে ছোট মাছ বা জাটকা নির্বিচারে মারা পড়ছে। এতে ইলিশের বংশবিস্তার চক্রটি প্রতি বছর দুর্বল হয়ে পড়ছে।

নিবন্ধন ও প্রণোদনার সীমাবদ্ধতা: জেলের সংখ্যা নিবন্ধিতদের তুলনায় অনেক বেশি। সরকারি চাল বা অনুদান প্রকৃত জেলেদের চেয়ে প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছানোর প্রবণতা বেশি, ফলে সংকটের সময় সত্যিকারের জেলেরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সংকট এখন আর কেবল মৎস্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ঋণচক্রের জালে জেলেরা: প্রতি মৌসুমে মাছ ধরার আশায় জেলেরা চড়া সুদে দাদন (ঋণ) নেন। টানা কয়েক মাস মাছ না পাওয়ায় তারা ঋণের বোঝা শোধ করতে পারছেন না। অনেকেই ভিটেমাটি বিক্রির পর্যায়ে চলে গেছেন।

আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের দেউলিয়াত্ব: মাছঘাটের আড়তদাররা জেলেদের অগ্রিম টাকা দেন। মাছ না পাওয়ায় আড়তদারদের বিনিয়োগ আটকে যাচ্ছে। এতে অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

শ্রমিকদের জীবনমান: ঘাট শ্রমিক, বরফকলের কর্মী এবং মৎস্য পরিবহনকারী শ্রমিকদের আয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে উপকূলীয় এলাকায় খাদ্য নিরাপত্তার অভাব দেখা দিচ্ছে। ভোলা, চাঁদপুর ও বরগুনার এই পরিস্থিতি দেশের জাতীয় মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই হবে না, বরং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। মৌসুমের বাকি সময়গুলোতে মাছের দেখা পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে এখন পুরো মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।
বিপি/টিআই

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি