২৭ আগস্ট ২০২৬

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা

বাংলাপ্রেস ডেস্ক:  নেপালে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার যে কম্পন বুধবার সকালে অনুভূত হয়েছিল, তা ভূমিকম্পের কারণে নয়- ভূমিধসের কারণে হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বুধবার রাতে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে যে, হিমবাহ ধসে পড়া এবং এর সঙ্গে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নামার কারণে ওই কম্পন তৈরি হয়েছিল।

এর আগে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ইউএসজিএস জানায়, কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। পরে সংস্থাটি তাদের তথ্য সংশোধন করে জানায়, সেখানে কোনো ভূমিকম্প হয়নি। যে কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের কারণে তৈরি হয়েছিল। ইউএসজিএস জানায়, এই ঘটনায় নদীর নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে।

প্রাথমিকভাবে প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের বড় একটি ভূমিধসের কারণে লহেন্দে নদীতে হঠাৎ কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নামে। ঘটনাটি নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ঘটে।

লহেন্দে নদী ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা। নদীটি চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে নেপালে প্রবাহিত হয়েছে।

হিমবাহ ও পাথর ধসে নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার পর ভোতে কোশি নদীতেও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এই বন্যায় নেপালে ১৫৭ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভয়াবহ ওই ভূমিধসের শক্তি পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। আকস্মিক বন্যার পর নেপালের রাসুওয়া, ধাদিং ও নুওয়াকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ শুরু হয়েছে। নেপাল পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে। তবে দুর্যোগের কয়েক ঘণ্টা পরও শত শত মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পর্যটন বোর্ড। কাদা ও পানির নিচে আটকে থাকা মানুষ এবং মরদেহ উদ্ধারে উদ্ধারকারীরা কাজ করছেন। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। সারা দিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখা গেছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সরকারের সব ধরনের সম্পদ ব্যবহার করা হবে।

স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির ঢল নামে। তিব্বতের দিক থেকে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে এসে নদীটি প্লাবিত করে। নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া ও ধাদিং জেলা এবং নুওয়াকোট জেলার বিভিন্ন এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসায় বহু বাড়িঘর, গাছপালা ও যানবাহন পানিতে ডুবে যায়। অনেক স্থাপনা ও যানবাহন কাদার নিচে চাপা পড়ে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের তিব্বত অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা গেছে, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত নেমে আসার আগে অনেক মানুষ দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রবল স্রোত ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

এদিকে তিব্বতের গিরং এলাকায়ও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নিহতের সংখ্যা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তিব্বত অংশেও উদ্ধারকাজ চলছে। সীমান্তের দুই পাশেই পানির প্রবল স্রোত, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে যোগাযোগ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত নুওয়াকোট ও ধাদিং এলাকার অনেক বাসিন্দা নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়েছেন। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করতে সেখানে তালিকা তৈরি করছে পুলিশ। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। ফলে পুলিশ সদস্যদের মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলো ব্যবহার করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম ও তথ্য লিখে রাখতে দেখা গেছে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে আটকে পড়া জীবিত মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বাড়িঘর, গাছপালা ও যানবাহন পানিতে ডুবে গেছে বা কাদার নিচে চাপা পড়েছে। একই সঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধারের কাজও চলছে। জীবিতদের উদ্ধার করে নিয়ে যেতে সারা দিন ওই এলাকার আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিয়েছে। দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান করা এবং দুর্গতদের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া।

বিপি>টিডি
 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি