আমার কলমে হাতকড়া
কবিতা-আমার কলমে হাতকড়া
আমার কলমে হাতকড়া
– ছাবেদ সাথী
সেদিন রাতের নিউ ইয়র্ক
আলোয় ডুবে ছিল—
হোটেলের কাচে ঝলমল করছিল শহর,
মানুষ ফিরছিল মানুষের কাছে,
শুধু আমি জানতাম না—
আমার ফেরার পথের শেষে
বাড়ি নয়,
অপেক্ষা করছে একটি হাতকড়া।
আমি গিয়েছিলাম সংবাদ লিখতে,
হাতে ছিল কলম,
চোখে ছিল ঘটনার সত্য,
মনে ছিল পুরোনো এক বিশ্বাস—
যা দেখব, তা লিখব;
যা শুনব, যাচাই করব;
আর সত্যের সামনে
মাথা নত করব না।
কে জানত,
একদিন সেই সংবাদ থেকে উঠে আসবে
কয়েকটি উত্তপ্ত মুখ,
কয়েকটি মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আর আমারই দিকে ছুটে আসবে
আমার লেখা শব্দের প্রতিশোধ!
২৪ আগস্ট, ২০২৫
রাত তখন দশটা পেরিয়েছে।
আমি শুধু বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু পার্কিংয়ের পথে
হঠাৎ রাতের ভাষা বদলে গেল
প্রশ্নের জায়গায় এলো গালি,
যুক্তির জায়গায় মুষ্টি,
শব্দের বিরুদ্ধে দাঁড়াল
শরীরের শক্তি।
আমি দৌড়ে ফিরে এলাম আলোয়,
হোটেলের লবিতে—
সভ্যতার নিরাপদ ঠিকানা ভেবে।
কাঁপা হাতে ফোন তুললাম—
নাইন-ওয়ান-ওয়ান
বললাম,
আমি আক্রান্ত,
আমাকে সাহায্য করুন।
পুলিশ এলো
আমি তখনও লিখছি—
ইনসিডেন্ট রিপোর্টের সাদা পাতায়
একটি কালো রাতের ইতিহাস
বললাম—
ক্যামেরা দেখুন,
সিসিটিভি দেখুন,
আমার কথাটুকুও শুনুন।
কিন্তু কী আশ্চর্য!
যে হাত একটু আগে
সাহায্যের জন্য ফোন করেছিল,
সেই হাতেই
ঠান্ডা লোহার বৃত্ত।
ক্লিক!
একটি ছোট্ট শব্দ।
অথচ সেই শব্দে
কত বড় পৃথিবী বদলে যায়
আমি সাংবাদিক থেকে
মুহূর্তেই হয়ে গেলাম বন্দি।
চারদিকে পরিচিত মুখ ছিল
সহকর্মী ছিল
বন্ধু ছিল,
সাংবাদিক ছিল—
কিন্তু আমার পাশে
একটি কণ্ঠও ছিল না
কেউ বলল না—
'ওর কথাটাও শুনুন।
সেদিন বুঝেছি,
মুষ্টির আঘাত শুধু শরীরে লাগে না,
কখনো কখনো
মানুষের নীরবতাও
ঘুষির চেয়ে গভীর ক্ষত রেখে যায়।
তারপর—
লোহার দরজা
বদ্ধ ঘর
অপরিচ্ছন্ন টয়লেট
ঘামে, ক্লান্তিতে, অপমানে
ভারী হয়ে থাকা বাতাস
আমার সামনে
আরেক আমেরিকা।
যে আমেরিকাকে
ম্যানহাটনের আলোয় দেখা যায় না,
টাইমস স্কয়ারের বিলবোর্ডে দেখা যায় না,
স্বাধীনতার মূর্তির ছবিতেও নয়।
সেখানে একজন মানুষ চিৎকার করছে—
'পানি!'
আরেকজন—
'একটু পানি!'
তারপর আরও একটি কণ্ঠ—
'পানি...'
এক গ্লাস পানি!
পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশের
একটি বন্দিশালায় দাঁড়িয়ে
হঠাৎ মনে হলো—
সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
আকাশচুম্বী ভবন নয়,
অস্ত্র নয়,
অর্থ নয়—
তৃষ্ণার্ত একজন বন্দির হাতে
সময়মতো
এক গ্লাস পানি তুলে দেওয়া
সেই রাতে
আমার তৃষ্ণা শুধু পানির ছিল না।
আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম
ন্যায়ের জন্য,
একটি নিরপেক্ষ প্রশ্নের জন্য,
একবার ক্যামেরাটি দেখার জন্য,
একবার আমার কথাটি শোনার জন্য।
হাতকড়া পরে ভাবছিলাম—
হাতকড়া কি রায়?
না।
গ্রেপ্তার কি অপরাধের প্রমাণ?
না
অভিযোগ কি সত্যের শেষ বাক্য?
না
তবু মানুষ যখন দেখে
দুই হাত পেছনে বাঁধা,
পাশে পুলিশ—
অনেকেই তখন
আদালতের আগেই রায় লিখে ফেলে।
আমি সাংবাদিক
শব্দের শক্তি জানি।
তাই এটাও জানি—
আমার কলম ভুল করলে
তার উত্তরও শব্দে দাও
তথ্য দিয়ে দাও
প্রমাণ দিয়ে দাও
প্রতিবাদ লিখে দাও
আদালতের দরজায় যাও।
কিন্তু—
সংবাদের উত্তর মুষ্টি নয়
কলমের উত্তর আঘাত নয়।
সত্যের সংশোধনী
কখনো সহিংসতা হতে পারে না।
একদিন, একরাত—
ঘড়ির হিসাবে
খুব বেশি সময় নয়।
কিন্তু কিছু রাত
চব্বিশ ঘণ্টায় শেষ হয় না।
কিছু রাত
মানুষের ভেতরে থেকে যায়
বছরের পর বছর।
আজও কখনো
পুলিশের গাড়ির নীল-লাল আলো দেখলে,
হাতকড়া পরা কোনো মানুষের ছবি দেখলে,
আমি ছবিটির পেছনে
আরেকটি অদৃশ্য ছবি খুঁজি।
ভাবি—
তার গল্পটি কী?
তার কথাটি কি কেউ শুনেছে?
প্রমাণগুলো কি দেখা হয়েছে?
নাকি তার জীবনেও
সত্যের আগে
হাতকড়ার শব্দ শোনা গেছে?
সেদিন আমার হাতে
লোহার হাতকড়া ছিল
আজ নেই।
আমার কবজিতে হয়তো
তার স্মৃতি আছে,
আমার মনে আছে সেই রাত,
আমার কানে আজও বাজে—
'একটু পানি...'
কিন্তু আমার আঙুলে
আবার কলম
তারা আমার চলার পথ
কিছু সময়ের জন্য থামাতে পেরেছিল,
আমার দুই হাত
লোহায় বেঁধেছিল—
কিন্তু শব্দকে বাঁধতে পারেনি।
কারণ কলমেরও একটি আশ্চর্য জীবন আছে—
তাকে যত চেপে ধরা হয়,
সে তত বেশি
সত্যের দিকে ছুটতে চায়।
তাই আজ
আমি আবার লিখছি
আমার অপমান লিখছি,
আমার একাকিত্ব লিখছি,
বন্দিশালার তৃষ্ণা লিখছি,
মানুষের নীরবতা লিখছি,
আর লিখছি সেই বিশ্বাস—
সাংবাদিকতা অপরাধ নয়
সত্য কোনো অস্ত্র নয়
হাতকড়া কোনো রায় নয়।
সেই রাতে
আমার দুই হাতে
হাতকড়া পরানো হয়েছিল—
তারা হয়তো ভেবেছিল
আমার কলমেও
হাতকড়া পড়েছে
ভুল ভেবেছিল।
হাতকড়া খুলে গেছে
কলমটি এখনো আমার হাতে
কালি এখনো শুকায়নি।
আর আমার গল্প—
এখনো শেষ হয়নি।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি