১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমেরিকায় ঢুকছে লাখ লাখ নতুন ‘সাইবার-অভিবাসী’

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম
আমেরিকায় ঢুকছে লাখ লাখ নতুন ‘সাইবার-অভিবাসী’

আমেরিকায় ঢুকছে লাখ লাখ নতুন ‘সাইবার-অভিবাসী’

ছাবেদ সাথী
ডানপন্থী ভাষ্যকার জো অ্যালেন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, সিলিকন ভ্যালি এক নতুন ঢেউয়ের ‘অ্যালগরিদমিক অভিবাসী’ ছেড়ে দিচ্ছে। এই ডিজিটাল কর্মীরা সার্ভার ফার্ম থেকে দিনরাত কাজ করছে এবং লাখ লাখ আমেরিকানের চাকরির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। তাদের স্বাস্থ্যবিমা লাগে না, অসুস্থতার ছুটি নিতে হয় না, এমনকি তারা কখনো বেতন বাড়ানোর দাবিও করে না।

সফটওয়্যারকে ‘অভিবাসী’ বলা উচিত কি না—এ নিয়ে সারাদিন তর্ক করা যেতে পারে। কিন্তু তাতে মূল বিষয়টি আড়াল হয়ে যায়।

মাঝারি পর্যায়ের একজন হোয়াইট-কলার কর্মী বছরে প্রায় ২,০০০ ঘণ্টা কাজ করেন। অন্যদিকে ক্লাউড কম্পিউটিং অবকাঠামোয় চালু থাকা সফটওয়্যার বছরে ৮,৭৬০ ঘণ্টাই বিরতিহীনভাবে কাজ করতে পারে।

প্রকৃত ক্ষতি একজন কর্মী চাকরিচ্যুত হওয়ার অনেক আগেই শুরু হতে পারে। নিয়োগকর্তারা বুঝতে পারেন, সবাইকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; অটোমেশনের সম্ভাবনাই কর্মীদের দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে।

ধরা যাক, একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বার্ষিক মূল্যায়নের সময় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৮ শতাংশ বেতন বাড়ানোর দাবি করলেন। টেবিলের অপর পাশে বসা নির্বাহী কম্পিউটারে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম দেখালেন, যা ওই বিশ্লেষকের দৈনন্দিন কাজের ৭০ শতাংশ সম্পন্ন করতে সক্ষম। তখন বেতন বৃদ্ধির আলোচনা উধাও হয়ে যেতে পারে। তার পরিবর্তে কর্মীকে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হতে পারে যে, চাকরিটি এখনও আছে—এতেই তাঁর সন্তুষ্ট থাকা উচিত।

জেনারেশন এক্স ও মিলেনিয়ালদের একটি নির্দিষ্ট জীবনপথ অনুসরণ করতে শেখানো হয়েছিল: কলেজে যাও, হাজার হাজার ডলারের ঋণ নাও, কাঠামোবদ্ধ তথ্য প্রক্রিয়াকরণ শেখো, তারপর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোনো অফিসে চাকরি নিশ্চিত করো।

কয়েক দশক ধরে শিক্ষাব্যবস্থা এমন কর্মী তৈরি করেছে, যাদের কাজ ছিল প্রতিবেদন সংক্ষেপ করা, চুক্তিপত্রের খসড়া তৈরি, সফটওয়্যার লেখা এবং স্প্রেডশিট বিশ্লেষণ করা। এখন হঠাৎ করেই ঠিক একই ধরনের কাজ করতে সক্ষম যন্ত্র ও সফটওয়্যার অনেক ক্ষেত্রে আরও দ্রুত এবং কম খরচে কাজ করছে। অর্থনীতির খেলার নিয়ম যেন বদলে গেছে, অথচ লাখ লাখ মানুষ এখনও সেই খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য নেওয়া শিক্ষাঋণ পরিশোধ করছেন।

রাজনীতিবিদ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা প্রায়ই শিল্পোত্তর যুগের পরিচিত পরামর্শের আশ্রয় নেন। চাকরি হারানো কর্মীদের বলা হয়—নতুন প্রশিক্ষণ নিন, নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করুন এবং আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিন।

৪৫ বছর বয়সী একজন প্যারালিগ্যালকে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট শেখার পরামর্শ প্রথমে যুক্তিসংগত শোনাতে পারে। কিন্তু সেই সফটওয়্যারই যখন একজন অভিজ্ঞ কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটের চেয়েও দ্রুত কোড লিখতে শুরু করে, তখন প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

কয়েক সপ্তাহ পরপর নিজেকে হালনাগাদ করা একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মীদের সারাক্ষণ পাল্লা দিতে বলা মানসিক ও আর্থিক ক্লান্তি সৃষ্টি করতে পারে। মানুষের পরিবার আছে, সম্পত্তি কর দিতে হয়, স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম দিতে হয়। কর্মজীবনের মাঝপথে নতুন পেশায় যাওয়ার জন্য তিন বছর ব্যয় করার সময় এসব খরচ থেমে থাকে না।

অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটাতে কোনো কোম্পানিকে তার সব কর্মীকে ছাঁটাই করতে হবে না। ১০০ জনের একটি বিভাগকে ৬০ জনে নামিয়ে আনলেই ৪০ জন বিশেষজ্ঞ হঠাৎ বেকার হয়ে যাবেন। তারা তখন ক্রমশ কমতে থাকা চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করবেন। এর ফলে পুরো খাতেই মজুরি বৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

americar-vitore-baire

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বাড়তে পারে এবং মুনাফাও বৃদ্ধি পেতে পারে। কোম্পানি লাভবান হলেও আরও বেশি আমেরিকান নিজেদের এলাকায় বসবাসের খরচ বহন করতে বা বাড়ির মর্টগেজ পরিশোধ করতে সমস্যায় পড়তে পারেন।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাফল্য এবং সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রার মধ্যে ব্যবধান তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে, একই সময়ে ব্যক্তিপর্যায়ে অনেক মানুষ আরও দরিদ্র হয়ে পড়তে পারেন।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর পড়তে পারে—মূলত মধ্যবিত্তের বিপুলসংখ্যক চাকরি তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে লেখক যুক্তি দিয়েছেন।

ক্যালেন্ডার পরিচালনা, বিপণনের লেখা তৈরি এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি বা বার্তা প্রস্তুত ও অনুবাদের মতো কাজ শহরতলির মধ্যবিত্ত অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন তরুণের প্রাথমিক পর্যায়ের সেবাখাতের চাকরি হারানো অবশ্যই তার পরিকল্পনায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। কিন্তু একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীর বছরে এক লাখ ডলারের পেশাগত চাকরি হারানো পুরো পরিবারের আর্থিক ভিত্তিই নড়িয়ে দিতে পারে।

চাকরি হারানো অফিসকর্মীদের নির্মাণ বা কারিগরি পেশায় চলে যেতে বলা সম্পাদকীয় নিবন্ধে সহজ শোনায়, কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। একজন সাবেক কপিরাইটার রাতারাতি লাইসেন্সধারী ইলেকট্রিশিয়ান হতে পারেন না। দক্ষ কারিগরি পেশায় বছরের পর বছর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন—যা কর্মজীবনের মাঝপথে থাকা একজন অফিসকর্মীর পক্ষে সহজে অর্জন করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া লাখ লাখ চাকরিহারা মধ্যপর্যায়ের ব্যবস্থাপক যদি একযোগে কারিগরি পেশায় প্রবেশের চেষ্টা করেন, তাহলে প্লাম্বার, কার্পেন্টারসহ বিদ্যমান দক্ষ কর্মীদের মজুরিতেও নেতিবাচক চাপ তৈরি হতে পারে বলে লেখক আশঙ্কা করেছেন।

করপোরেশনগুলো উদ্বিগ্ন শেয়ারহোল্ডার ও নিয়ন্ত্রকদের আশ্বস্ত করতে ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ বা ‘প্রক্রিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণ’ ধরনের শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষটি হয়তো এমন একজন একাকী তত্ত্বাবধায়ক, যিনি আগে ২০ জন সহকর্মী যে কাজ করতেন, সেই কাজ করা সফটওয়্যার পর্যবেক্ষণ করছেন।

কাজের পরিমাণ একই থাকতে পারে, কিন্তু কর্মীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে। এরপরও প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিভাগ দাবি করতে পারে, কাউকে প্রকৃত অর্থে প্রতিস্থাপন করা হয়নি—কারণ শেষ বোতামটি এখনও একজন মানুষই চাপছেন।

সবশেষে রয়েছে অটোমেশন চালুর প্রক্রিয়ার আরেকটি বিদ্রূপাত্মক দিক। অনেক প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞ কর্মীদের দিয়েই তাদের দৈনন্দিন কাজের পদ্ধতি লিখিয়ে নেয়, কাজের ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সিস্টেমে আপলোড করায় এবং স্বয়ংক্রিয় টুলের ভুল সংশোধন করায়।

অর্থাৎ কর্মীরা মাসের পর মাস নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান এমন একটি ব্যবস্থাকে শেখাতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের চাকরির প্রয়োজনীয়তাই কমিয়ে দিতে পারে। লেখকের ভাষায়, কর্মীরা কার্যত নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা নিজেরাই তৈরি করছেন—এমন একটি বার্ষিক বোনাসের অপেক্ষায়, যা হয়তো আর কখনো আসবে না।

এই অর্থনৈতিক গতিপথ যদি অস্বস্তিকর মনে হয়, তাহলে লেখকের মতে বৃহত্তর ভবিষ্যৎচিত্র আরও উদ্বেগজনক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। কিছু জরিপে এআইয়ের কারণে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য গুরুতর ঝুঁকির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে, যদিও এ ধরনের সম্ভাব্যতার হিসাব অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনো একক ঐকমত্য নেই।

মূল নিবন্ধে বিষয়টিকে আরও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করে বলা হয়েছে—একদিকে অ্যালগরিদম ধীরে ধীরে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে, অন্যদিকে অত্যন্ত উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আরও চরম অস্তিত্বগত আশঙ্কাও রয়েছে।

লেখকের উপসংহার হলো, সমাজ যেন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক অপ্রাসঙ্গিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং প্রযুক্তি নিয়ে আরও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ আশঙ্কার মাঝখানে আটকে পড়েছে। সমালোচকেরা এ ধরনের বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে অভিহিত করতে পারেন; তবে লেখকের দৃষ্টিতে বর্তমান প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতিপথ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার যথেষ্ট কারণ নেই।

ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস। 

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি