বৈধ অভিবাসী সেবাকর্মী হারিয়ে ঝুঁকিতে আমেরিকার প্রবীণরা
ছাবেদ সাথী'র কলাম আমেরিকার ভেতরে বাইরে
ছাবেদ সাথী
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ পরিচর্যা ব্যবস্থা ক্রমেই বড় ধরনের কর্মীসংকটের মুখে পড়ছে। এই খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অভিবাসী কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সংকুচিত হওয়া কিংবা কোনো কর্মীর বৈধ অভিবাসন মর্যাদা হারানোর প্রভাব শুধু শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা সরাসরি প্রবীণদের পরিচর্যাতেও প্রভাব ফেলে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার মান অনেকাংশে নির্ভর করে পর্যাপ্ত কর্মী এবং সেবার ধারাবাহিকতার ওপর। একই প্রশিক্ষিত সেবাকর্মী নিয়মিত একজন প্রবীণের দেখাশোনা করলে তিনি ওই ব্যক্তির দৈনন্দিন অভ্যাস, শারীরিক অবস্থা ও বিশেষ প্রয়োজন সম্পর্কে জানেন এবং কোনো বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত তা শনাক্ত করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ পরিচর্যা খাতে অভিবাসী কর্মীদের গুরুত্ব কয়েকটি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট—
প্রতি ৩ জন হোম কেয়ার কর্মীর মধ্যে প্রায় ১ জন অভিবাসী। অর্থাৎ হোম কেয়ার সেটিংয়ে সরাসরি সেবা দেওয়া কর্মীদের প্রায় ৩৩ শতাংশ অভিবাসী।
প্রতি ৫ জন নার্সিং হোম কর্মীর মধ্যে প্রায় ১ জন অভিবাসী। হার্ভার্ড, এমআইটি ও ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
আর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা খাতের সব ধরনের সরাসরি সেবাকর্মী—যেমন হোম হেলথ এইড, পার্সোনাল কেয়ার এইড ও নার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট—একসঙ্গে হিসাব করলে প্রায় ৩০ শতাংশ অভিবাসী।
কেএফএফ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৩ লাখ ডাইরেক্ট কেয়ার কর্মী প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ হোম কেয়ার, ২২ শতাংশ নার্সিং ফ্যাসিলিটি এবং ১২ শতাংশ রেসিডেনশিয়াল কেয়ার ফ্যাসিলিটিতে কাজ করেছেন।
অভিবাসী কর্মীদের ওপর নির্ভরতার মাত্রাও কর্মক্ষেত্রভেদে ভিন্ন। হোম কেয়ারে কর্মরত সরাসরি সেবাকর্মীদের প্রায় ৩৩ শতাংশ, নার্সিং ফ্যাসিলিটিতে ২৫ শতাংশ এবং রেসিডেনশিয়াল কেয়ার ফ্যাসিলিটিতে ২৩ শতাংশ অভিবাসী।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, অঙ্গরাজ্যভেদে এই নির্ভরতার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে সরাসরি পরিচর্যা কর্মীদের মধ্যে অভিবাসীর হার খুব কম হলেও নিউইয়র্কে তা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
সাম্প্রতিক গবেষণায় অভিবাসন এবং প্রবীণদের স্বাস্থ্যগত ফলাফলের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, কোনো মহানগর এলাকায় ১,০০০ নতুন অভিবাসী যুক্ত হলে তাদের মধ্যে আনুমানিক ১৪২ জন বিদেশে জন্ম নেওয়া স্বাস্থ্যসেবা কর্মী হিসেবে শ্রমবাজারে যুক্ত হতে পারেন। একই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের চাকরি হারানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণার মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহ ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দেশজুড়ে বছরে প্রায় ৫,০০০ প্রবীণের মৃত্যু কমতে পারে। গবেষকেরা নার্সিং হোমের ব্যবহার কমে যাওয়াকে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো এলাকায় অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত বিদেশে জন্ম নেওয়া শ্রমিকের অংশ ১০ শতাংশ পয়েন্ট বাড়লে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যায় যাওয়ার সম্ভাবনা ১.৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং ৮০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩.৮ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
অর্থাৎ অভিবাসী সেবাকর্মীর সহজলভ্যতা অনেক প্রবীণকে নার্সিং হোমে না গিয়ে নিজেদের বাড়িতেই নিরাপদে থেকে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা গ্রহণের সুযোগ করে দিতে পারে।
কর্মী কমলে বাড়ে পরিচর্যার চাপ
বৈধ অভিবাসনের পথ বাধাগ্রস্ত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষিত কর্মী হারাতে পারে। একসঙ্গে অনেক কর্মী চলে গেলে পরবর্তী শিফটের আগেই তাদের বিকল্প নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয় না।
ফলে অবশিষ্ট কর্মীদের ওপর আরও বেশি প্রবীণের দায়িত্ব এসে পড়ে। একজন সেবাকর্মীকে যত বেশি বাসিন্দার দেখাশোনা করতে হয়, প্রত্যেকের জন্য তার সময় তত কমে যায়। এতে পরিচর্যার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভুল, অবহেলা ও নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন প্রবীণরা। দীর্ঘদিনের পরিচিত সেবাকর্মীর সঙ্গে একজন প্রবীণের যে আস্থা ও বোঝাপড়া তৈরি হয়, তা রাতারাতি নতুন কর্মীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
এ কারণেই স্বাস্থ্য ও প্রবীণ পরিচর্যা খাতে বৈধ অভিবাসনের সুযোগকে শুধু অভিবাসননীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখলে চলবে না। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ পরিচর্যা অবকাঠামোর সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
একজন সেবাকর্মীর ভিসা বা বৈধ সুরক্ষার মেয়াদ শেষ হওয়া শুধু একজন কর্মী কমে যাওয়ার বিষয় নয়। এর অর্থ হতে পারে একজন প্রবীণ এমন একজন মানুষকে হারালেন, যিনি তার দৈনন্দিন অভ্যাস, পরিচর্যার প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য বিপদের লক্ষণ সবচেয়ে ভালো জানতেন।
আইনপ্রণেতারা যখন বৈধ অভিবাসনের এসব পথ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একটি অত্যন্ত বাস্তব প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে—
রাত ২টায় কোনো নার্সিং হোমে একজন অসহায় প্রবীণ সাহায্যের জন্য কল বাটন চাপলে তার ডাকে কে সাড়া দেবেন?
নীতিনির্ধারণী প্রতিবেদনে এর প্রভাব ধরা পড়ার অনেক আগেই সেই সিদ্ধান্তের বাস্তব পরিণতি অনুভব করবেন আমেরিকার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণ নাগরিকরা।
ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
Jalalabad Summer Bash
সঙ্গীত একাডেমি