আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের সেরা ১০ মুহূর্ত
সংগৃহীত
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা—দুটি নাম যেন একই গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘ অপেক্ষা, হতাশা, সমালোচনা আর একের পর এক ফাইনালে হার পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশের হয়ে সম্ভাব্য প্রায় সব অর্জনই ছুঁয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর আগে ২১ বছরের ক্যারিয়ারে আকাশি-সাদা জার্সিতে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন এলএমটেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ১০টি মুহূর্ত একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
১. আন্তর্জাতিক ফুটবলে যাত্রা শুরু
২০০৪ সালের ২৯ জুন আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা স্টেডিয়ামে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ৭-০ গোলে জিতলেও ফলাফলের চেয়েও আলোচনায় ছিল তরুণ মেসির আগমন। পরের বছর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলের মূল স্কোয়াডে অভিষেক হয় তার।
২. জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল
২০০৬ সালের ১ মার্চ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম গোল করেন মেসি। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে গোল করেন তিনি। এতে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে ম্যাচটি হেরে যায়।
৩. সমালোচনার কঠিন অধ্যায়
২০১১ কোপা আমেরিকায় প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় নিজ দেশেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন মেসি। উরুগুয়ের বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। চার ম্যাচ খেলেও কোনো গোল করতে পারেননি মেসি। সেই সময় সান্তা ফেতে সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া তীব্র সমালোচনার কথা পরে স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘সান্তা ফেতে আমাকে কত কিছুই না বলা হয়েছিল।’
৪. ব্রাজিলের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক
২০১২ সালের ৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান মেসি। ৪-৩ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। এর ফলে ব্রাজিলের বিপক্ষে এক ম্যাচে তিন গোল করা আর্জেন্টিনার মাত্র পঞ্চম খেলোয়াড় হন এই তারকা।
৫. ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসি
২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার হয়ে দুর্দান্ত ছিলেন মেসি। বসনিয়া ও ইরানের বিপক্ষে একটি করে এবং নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি গোল করেন তিনি। নকআউট পর্বে গোল না পেলেও অধিনায়ক হিসেবে দলকে ফাইনালে পৌঁছে দেন। তবে অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হেরে শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয় আর্জেন্টিনা। ব্যক্তিগতভাবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়ে গোল্ডেন বল জেতেন মেসি।
৬. অবসরের সিদ্ধান্ত, এরপর প্রত্যাবর্তন
২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মেসি। টানা চারটি ফাইনালে পরাজয়ের হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। সে সময় তার ভাষ্য ছিল, ‘এটাই শেষ। জাতীয় দলের হয়ে আর নয়; চারটি ফাইনাল, এটা আমার জন্য নয়। দুর্ভাগ্যবশত, আমি চেষ্টা করেছি। এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া, কিন্তু তা হলো না।’
তবে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভালোবাসা ও অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদল করেন মেসি। জাতীয় দলে ফিরে আসার পরই শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল সময়।
৭. দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথম বড় শিরোপা
চার ফাইনালে হার এবং ২৮ বছরের শিরোপাখরা—সব হতাশার অবসান ঘটে ২০২১ কোপা আমেরিকায়। মারাকানায় ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। দেশের হয়ে সেটিই ছিল মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। টুর্নামেন্টে চার গোল ও পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন তিনি।
৮. কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পূর্ণতা
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারের পর দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টে মেসির সংগ্রহ ছিল সাত গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট। পোল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ ছাড়া প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেন তিনি। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
৯. চোটের কান্নার মাঝেও শিরোপা
২০২৪ কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোড়ালিতে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় মেসিকে। বেঞ্চে বসে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে তার অনুপস্থিতিতেও জয় তুলে নেয় দল। লাউতারো মার্তিনেজের গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে টানা দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা শিরোপা নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। দেশের হয়ে এটিই মেসির শেষ বড় শিরোপা হয়ে আছে।
১০. শেষ বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস
২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন মেসি। টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নেমে করেছেন আট গোল। ফলে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১-এ। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তার ওপরে আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, যার গোলসংখ্যা ২২।
দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ে মেসির পথচলায় ছিল ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো, অসংখ্য রেকর্ড, কান্না ও শেষ পর্যন্ত একের পর এক শিরোপা জয়। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার এই অধ্যায় তাই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় গল্প হয়ে থাকবে।
বিপি>টিডি
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি