ফ্রান্সে ২২০ স্থানে বিক্ষোভ, মোতায়েন ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্ন মজুরি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে ২২০টি বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে সরকার। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি ও বিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ যুক্ত হলে এটি সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ সড়ক সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে।
গত ১৭ অক্টোবরের দেশব্যাপী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। ওই বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে। এবার একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে সরকার।
এদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভকারীদের অসন্তোষ প্রশমনে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। গত জুনে ৩৫ ইউরো বাড়ানোর পর বর্তমানে ফ্রান্সে মাসিক নিট ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৪৭৮ ইউরো। তবে দেশটির বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন সিএফডিটি প্রতি মাসে অন্তত ১০০ ইউরো মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।
বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপে থাকায় বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে এখনো অনীহা দেখাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে শিক্ষা খাতের সংকট মোকাবিলায় প্রায় তিন হাজার প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, আগামী বছর শিক্ষক ও কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যালয় সংস্কারে ৪০০ কোটি ইউরো ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।
তবে এসব প্রতিশ্রুতিতে আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আন্দোলনকারীদের একটি অংশের পাশাপাশি কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন আগামী শনিবার নতুন করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ১৭ অক্টোবরের পর থেকে প্রতি সপ্তাহেই এ ধরনের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন ও আবাসন অধিকার সংগঠন আগামী ২০ থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দেশটির অর্থনীতিতেও। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবরে দেশটির ভোক্তা আস্থা ২০১৩ সালের জুনের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আস্থাও কমেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে।
এদিকে সংখ্যালঘু সরকারের জন্য ২০২৭ সালের বাজেট পাস করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যয় সংকোচনের প্রস্তাব নিয়ে বিভক্ত পার্লামেন্টে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে বিরোধী দলগুলোর চাপে সরকারের পতনের আশঙ্কাও রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত মাসে দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৫ দশমিক ১৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ।
শুধু ফ্রান্সেই নয়, ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে একই ধরনের অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। গত শনিবার জার্মানির বড় শহরগুলোতে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভকারীদের একাংশ দোকানপাটে লুটপাট চালায়। গত মাসে ইতালিতেও সরকারি সেবার মান ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ ছাড়া স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলন চলছে।
ফ্রান্সের এই অস্থিরতা আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রায় এক দশক ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৭ সালের নির্বাচনে সরে দাঁড়াবেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে ডানপন্থী প্রার্থী মেরিন লে পেনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকা লে পেন এরই মধ্যে সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন।
অন্যদিকে বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর সমর্থনও বেড়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানানো এবং সরকারের সংকট মোকাবিলার সমালোচনা করায় তিনি আলোচনায় রয়েছেন। তবে আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনায় স্পষ্টভাবে নিন্দা না জানানোয় সরকারের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। মেলঁশোঁর দাবি, বিক্ষোভকারীদের দাবির কাছে মাখোঁর নতি স্বীকার করা উচিত, অন্যথায় তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।
এদিকে মাখোঁর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মধ্য-ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এদুয়ার ফিলিপ জনমত জরিপে লে পেন ও মেলঁশোঁর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। জনপ্রিয়তা ফিরে না পেলে আগামী বছরের মে মাসের চূড়ান্ত নির্বাচনী লড়াইয়ে জায়গা করে নেওয়াও তার জন্য কঠিন হতে পারে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা খাতের সংকট ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন ফ্রান্সের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সূত্র- রয়টার্স।
বিপি/টিআই
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
নির্বাচনী পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বিশ্বকে সংকটে ফেলতে পারেন ট্রাম্প
অঙ্গহারা ১১৩৪ ফিলিস্তিনি শিশুর বিদেশযাত্রায় বাধা দিচ্ছে ইসরাইল
সৌদির সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ৬ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা দাবি হুথিদের
সঙ্গীত একাডেমি