২৬ মে ২০২৬

গৌরীপুরের আছিয়া স্বামীর নামটি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় দেখে মরতে চান

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৩৯ পিএম
গৌরীপুরের আছিয়া স্বামীর নামটি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় দেখে মরতে চান

হুমায়ুন কবির, গৌরীপুর থেকে: যুদ্ধের সময় যুদ্ধাহত মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন এই সুলতান। যার পুরো নাম সুলতান উদ্দিন তালুকদার। মুক্তিযুদ্ধে রণাক্ষনের সাথী ছিলেন তিনি। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিববাড়ি যুব অর্ভ্যথনা ক্যাম্পে তিনি ছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবক। সেই ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধার নাম আজও গেজেটভূক্ত হয়নি। আক্ষেপ করে তার স্ত্রী আছিয়া সুলতানা বলেন, স্বামী দেখে যেতে পারেনি; আমি কী, দেখে যেতে পারবো! স্বামীর নামটি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায়? তিনি আরো বলেন, স্বামী চলে গেছে; আমিও চলে যাবো। অন্তত স্বামীর প্রাপ্য অধিকারটুকু নিয়ে মরতে চাই, মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গেজেটভুক্ত হবে স্বামীর নাম, এটা কারো দয়া বা করুণা নয়, এটা হলো আমার স্বামীর কাজের স্বীকৃতি।

এ স্বীকৃতি না পেলে পহেলা মার্চ থেকে আমিও আন্দোলনে নামবো। স্বামী সেবা করতো, আমি আমরণ অনশন করবো। ওকে গিয়ে বলতে পারবো, তোমার স্বীকৃতির জন্য আমিও লড়াই করে এসেছি। এ কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার আঁচলে মুখ মুছেন আছিয়া সুলতানা। সুলতান উদ্দিন তালুকদরের মৃত্যুর সময় তিনি পাননি রাষ্ট্রীয় মর্যাদাও। ২০০৪ সালের ৯ মে চিরবিদায় নেন। সেদিন ছিলো রোববার। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৪৮সালের ৩১জানুয়ারি ১৯৪৮। যুদ্ধের জন্য তিনি নিয়মিত লেখাপড়াও করতে পারেননি। লেখাপড়া ছেড়ে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। পরে ১৯৭২ সালে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্টিক পাস করেন। তার রোল গৌরী নাম্বার পি ৪৭১। যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে সুলতান উদ্দিন তালুকদার ছিলেন সর্দাপ্রস্তত। ক্যাম্পে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পরিচিত এক নাম ছিলো সুলতান।

এ ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনের জন্য মুজিবনগর সরকারের একজন ভাতাভোগীও ছিলেন। সর্বশেষ ১৯৭১সালের ১৫ নভেম্বর তারিখে ৭৫ টাকা সর্বশেষ ভাতাও উত্তোলন করেন তিনি। ভাতাভোগীর ১১ জনের মধ্যে তাঁর ক্রমিক নং ৯। এ তালিকার ১০ জনই মুক্তিযোদ্ধা। শুধু গেজেটভুক্ত হয়নি সুলতান উদ্দিন তালুকাদারের নাম! এছাড়াও আরো একটি মুক্তিযোদ্ধা তালিকা (অর্ন্তভূক্তি) ৪০ জনের যে তালিকা প্রস্তত হয় সেখানে সুলতান উদ্দিন তালুকদারের নাম ১৫নং ক্রমিকে। এ তালিকার অনেকেই গেজেটভুক্ত হয়েছেন। হয়নি সুলতান উদ্দিন তালুকদারের নাম। অপরদিকে স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য ২০০৬ সালে প্রথম আবেদন করেন আছিয়া সুলতানা। এরপর থেকে বারবার এ দপ্তর, ওই মন্ত্রণালয় ঘুরতে ঘুরতে আজ তিনি কান্ত। সাক্ষাতকার ও যাছাই বাচাইয়ের আসরে যেতে যেতে তিনিও হাঁপিয়ে উঠেছেন। আছিয়া সুলতানের বর্তমান বয়স ৮০ ছুঁইছুঁই করছে। শরীরে বাসা বেঁধেছে বার্ধ্যকজনিত নানা রোগ। এই আছেন ভালো, এইতো খারাপ এমন অবস্থায় কাটছে দিন। অপরদিকে ১৯৭২সালের ৯ ফেব্রুরিতে ভারতের শিববাড়ি ইয়ুথ ক্যাম্পের ইনচার্জ ডা: এম.এ সোবহান প্রত্যয়নে লিখেছেন, মোঃ সুলতান উদ্দিন তালুকদার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিববাড়ী যুব শিবিরে ১৯৭১ সালের মে মাসে যোগ দেন। ১৬ডিসেম্বর বিজয় ঘোষণা পূর্বপর্যন্ত তিনি ছিলেন এই ক্যাম্পে।

শিবিরে দীর্ঘকাল অবস্থানকালীন সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাধিক মূল্যবান ও যুদ্ধাহতদের নিরলসভাবে সেবা দেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এমসিএ হাতেম আলী মিয়া দেয়া প্রত্যয়নপত্রে লিখেন শিবিরে তাঁর দীর্ঘ অবস্থানকালে তিনি সর্বাধিক পসবা মুক্তির উদ্দেশ্যে কাজ করেন। তার মনোযোগ ছিলো সবসময় সেবা দেয়া। সুলতান উদ্দিন তালুকদার মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিমাসে ৭৫ রুপী সম্মানী ভাতা পেতেন। তিনি এ প্রত্যয়ন প্রদান করেন ১৯৭৭সালের ৭ ফেব্রুয়ারিতে। স্বামীর নামটি গেজেটভূক্ত করতে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২২ মে অনলাইনে আবেদন করেন আছিয়া সুলতানা। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৭সালের ২৭জুন যাছাই বাচাই হয়। সেই যাছাই-বাচাই কমিটিতে ছিলেন সাত জন সদস্য। তারা হলেন সভাপতি ১৪৮ ময়মনসিংহ-৩ গৌরীপুর আসনে এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ, সচিব সচিব উপজেলা নির্বাহী অফিসার মর্জিনা খাতুন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ময়মনসিংহ জেলা কমা-রের প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ, সভাপতি, উপজেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুর রহিম, কেন্দ্রীয় কমা- কমান্ডার কাউন্সিলের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন, জামুকার প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কদ্দুছ।

এ কমিটির সাক্ষ্য, মুক্তিযোদ্ধার প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে ৬জনকে তালিকাভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করেন। এ তালিকার ১নং ক্রমিকে ছিলো সুলতান উদ্দিন তালুকাদারের নাম। অথচ অন্যদের হলেও এবারও বাদ পড়েছেন তিনি। ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রকাশিত তালিকা নাম না দেখে এবার ভেঙ্গে মুচড়ে পড়েন আছিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, এবার শুধু আমি নই; আমার পুরো পরিবার হতাশ। আমার স্বামী যুদ্ধে গিয়েছিলো, তালিকায় নাম তুলতে নয়, যুদ্ধ করতে। আমরা শুধু তার প্রাপ্য অধিকারটুকু দেখে যেতে চাই। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কদ্দুছ বলেন, যে তালিকার ৫ জন হলো সেই তালিকার এক নম্বর ক্রমিকের নাম বাদ পড়ে কিভাবে ? মুক্তিযুদ্ধ করার পরেও তালিকায় নাম উঠানোর জন্য আরেকটা যুদ্ধ করতে হবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনকও।

বিপি/কেজে

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

FIRDAUS FASHIONS


FIRDAUS FASHIONS

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি