২১ মে ২০২৬

আইএমএফ-এর প্রতিবেদন

জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ


বাংলাপ্রেস ডেস্ক: সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ তাদের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।


এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছর শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে দুই হাজার ৯১১ ডলার, আর ভারতের দুই হাজার ৮১২ ডলার। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধীরগতির কারণে এ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানিয়েছে আইএমএফ।

আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ তুলনায় ভারতের অর্থনীতি অনেক বড়। তবে চলতি বছর মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই হার সামান্য কিছু বাড়লেও পরবর্তী বছর, ২০২৭ সালে আবার বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে যেতে পারে ভারত।


অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মাথাপিছু জিডিপি বাড়ার পূর্বাভাস দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগার খুব বেশি সুযোগ নেই। কারণ এটা বাংলাদেশের মানুষের জীবনমানে খুব একটা পরিবর্তন আনবে না।

মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতাসহ কয়েকটি কারণে হতে পারে বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।


কী আছে আইএমএফ’র প্রতিবেদনে?

আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ সাধারণত বছরে দুইবার প্রকাশিত হয়, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

গত ১৪ এপ্রিল আইএমএফ যে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ বছর যেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে দুই হাজার ৯১১ ডলার, সেখানে ভারতের হতে পারে দুই হাজার ৮১২ ডলার।

এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের যে হিসাব রয়েছে সেখানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ভারতের জিডিপি ছিল তিন হাজার ৯১৬ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে বাংলাদেশের মাত্র ৪৫৮ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনেক বেশি পার্থক্য রয়েছে। কোনো এক বছরের মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে কোনো একটি দেশের অর্থনীতিকে তুলনামূলক পার্থক্যের জায়গায় নেওয়ার সুযোগ নেই।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যেহেতু আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হারকে জিডিপি দিয়ে ভাগ করা হয়, সে কারণে এই পার ক্যাপিটা জিডিপিতেও পরিবর্তন আসে। আইএমএফের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলেও সেটি আরো স্পষ্ট হয়।’

এই অর্থনীতিবিদের এই বক্তব্য কিছুটা স্পষ্ট হয় রিপোর্টের পরের ধাপে। কেননা ২০২৬ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি কমলেও ২০২৭ সালে সেটি আরো বাড়তে পারে বলেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আর এই বৃদ্ধি ২০৩১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলেও ধারণা দিচ্ছে আইএমএফ।

অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলছিলেন, ‘জিডিপিতে এগিয়ে থাকা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে সংকটে আছে এখানে এটা আমাদের খুব বেশি স্বস্তির বার্তা দিবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।’

দুই দেশের জিডিপিতে পার্থক্যের কারণ কী?

জনসংখ্যা কিংবা অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে পার্থক্য অনেক। তবু নানা কারণে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিক থেকে দুইটি দেশের গড় হিসাবের মধ্যে এক ধরনের তুলনা আসে এবং হ্রাস-বৃদ্ধির চিত্র দেখা যায় অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিডিপি যেভাবে হিসাব করা হয়, সেটি একটি ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি। কেননা জিডিপি শুধু যেসব পণ্য ও সেবা বাজারে অর্থের বিনিময়ে কেনাবেচা করা যায়, সেগুলোকেই হিসাবের মধ্যে নেয়।

অন্যদিকে, এই প্রবৃদ্ধির হিসাব অনুমাননির্ভরও হয়ে থাকে, যে কারণে আইএমএফ যে পূর্বাভাস দেওয়া হয় সেটি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তবে এর পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার, মুদ্রাস্ফীতিসহ বেশ কিছু কারণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যেহেতু দেশীয় মুদ্রার বিনিময় হার দিয়ে জিডিপিকে ভাগ দেওয়া হয়, সেখানে যেই মুদ্রার বিনিময় হার ডিপ্রেশিয়েট (অবমূল্যায়ন) করেছে তারটা তো ডলারে কমে যায়। এটা একটি অন্যতম কারণ হতে পারে।’

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমানে আইএমএফ যে পূর্বাভাস দিচ্ছে তার অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে নানা কারণে। তার মধ্যে অন্যতম একটি কারণ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি। যে কারণে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের এক বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়াও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে এমনটি নয়।

অর্থনীতিবিদ ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘এর আগেও মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারত থেকে এগিয়ে ছিল। তার মানে এই না যে আমাদের অর্থনীতি ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। কেননা বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেক জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।’

অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, ‘এটা নিয়ে আত্মসন্তুষ্টিতে সময় কাটানোর কোনো সুযোগই নেই। কেননা আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী, বিনিয়োগেও আছে স্থবিরতা। সেই সঙ্গে এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, মূল্যস্ফীতির ধাক্কা লেগেছে ভালোমতোই।’

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জিডিপির হিসাবের এই তথ্যগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা প্রশ্ন ছিল। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে মাথাপিছু জিডিপির হিসাব নিয়ে দুই দেশের কারোরই উৎসাহিত হওয়া কিংবা উপসংহারে আসার সুযোগ নেই।

মাথাপিছু জিডিপি কী?

অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি। একটি নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে দেশের সব উৎপাদনের উপাদানগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে মোট যে পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকর্ম উৎপাদিত হয়, তার সমষ্টিকে মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি বলে।

অন্যদিকে মাথাপিছু জিডিপি হলো একটি দেশের ব্যক্তিপ্রতি অর্থনৈতিক উৎপাদনের পরিমাপ। মূলত কোনো দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপিকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথাপিছু জিডিপি নির্ধারণ করা হয়।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট বছরে যে পরিমাণ উৎপাদন করি, সেই উৎপাদন যদি সবার মাঝে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হলে সেটা হলো মাথাপিছু জিডিপি।’

‘ধরেন এক বছরে বাংলাদেশ ৪৫০ বিলিয়ন ডলার উৎপাদন করল, এখন সেটা যদি দেশের ১৭ কোটি মানুষের মাঝখানে ভাগ করে দেওয়া হয় তাহলে সেই সংখ্যা যেটি দাঁড়াবে সেটা হলো মাথাপিছু জিডিপি।’

সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেছে।

এতে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬২৫ মার্কিন ডলার। বর্তমান বিশ্বে মাথাপিছু জিডিপির গড় প্রায় ১৫ হাজার ৬০০ ডলার, আর উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর গড় প্রায় সাত হাজার ৫০০ ডলার।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

বিপি/কেজে

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

FIRDAUS FASHIONS


FIRDAUS FASHIONS

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি