কেন অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় আমেরিকার জন্য ক্ষতিকর
তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি সিনেটের সামনে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, কংগ্রেস যদি প্রতিরক্ষা খাতে প্রস্তাবিত পুরো ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রকে বিপদের মুখে ফেলবে।
হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের সামনে থাকা হুমকিগুলোকে অতিরঞ্জিত করে এবং সবচেয়ে খারাপ সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। একই সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদ ২০২৭ অর্থবছরের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (NDAA) এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ সমন্বয় বিলও পাস করেছে।
তবে হেগসেথের বক্তব্যের বিপরীতে বলা যায়, হুমকিকে অতিরঞ্জিত করা এবং অস্বাভাবিক বড় প্রতিরক্ষা বাজেট বরং আমেরিকাকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।
প্রথমত, এই ব্যয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর যথাযথ সামঞ্জস্য নেই। আইনপ্রণেতাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যেসব হুমকির মুখোমুখি, তাতে কোনো অস্ত্রব্যবস্থা বা প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে কাটছাঁট করার ঝুঁকি নেওয়া যায় না।
এমনকি এই বাজেটে B-1B বোমারু বিমান-এর মতো পুরোনো ব্যবস্থাও বাদ দেওয়া হয়নি। বিমানটিতে স্টেলথ সক্ষমতা নেই এবং B-52-এর তুলনায় এর পরিচালন ব্যয় বেশি। একইভাবে কয়েক দশকের পুরোনো পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র Minuteman III-ও বহাল রাখা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, প্রথম আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় পারমাণবিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
ফলে এমন সব অস্ত্রের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় অব্যাহত রয়েছে, যেগুলো দেশের নিরাপত্তা কতটা শক্তিশালী করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এর পাশাপাশি নীতিনির্ধারকেরা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে আরও কিছু ব্যয়বহুল ব্যবস্থা যুক্ত করতে চাইছেন, যেগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
পেন্টাগন আবার ব্যাটলশিপ নির্মাণ করতে চায়—এমন এক ধরনের যুদ্ধজাহাজ, যার ব্যবহার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনেক পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা একই সঙ্গে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এমন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষকে আকস্মিক হামলার দিকে উৎসাহিত করতে পারে, যাতে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রব্যবস্থার পেছনে ব্যয় করা এই বিপুল অর্থের অন্তত একটি অংশ আরও কার্যকর সামরিক খাতে—যেমন গোলাবারুদ ও অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে—ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর
ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি খরচ, বিশেষ করে সরকারি ঋণের সুদের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে সমালোচকদের অভিযোগ।
ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়লেও তাদের ওপর সরাসরি কোনো প্রভাব পড়বে না। এতে নীতিনির্ধারকেরা তাৎক্ষণিকভাবে কর বাড়ানো বা সামাজিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ হচ্ছে ব্যয়ের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঠেলে দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ এবং ইরাক যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে বিপুল অর্থ ঋণ করেছে। এভাবে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নাগরিকদের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে—সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যাপক কাটছাঁট, কর বৃদ্ধি অথবা ঋণ পরিশোধে সহায়তার জন্য প্রতিরক্ষা কর্মসূচিই কমিয়ে দেওয়া।
অর্থনৈতিক শক্তিও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ
সমালোচকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জনগণের সামগ্রিক কল্যাণকে দুর্বল করতে পারে। তাদের যুক্তি, ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন ধরনের ব্যয়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর।
উচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সমর্থকেরা যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) তুলনামূলক ছোট একটি অংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে এবং সে কারণে আরও ব্যয় করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই যুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত থাকে—এই অতিরিক্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না এবং সেই অর্থ আরও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অগ্রাধিকারে ব্যবহার করা যেত কি না।
সুতরাং লেখকের যুক্তি অনুযায়ী, হেগসেথ ও ট্রাম্পের উচ্চ প্রতিরক্ষা বাজেট যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে না; বরং এটি আমেরিকানদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, দেশের অর্থনৈতিক শক্তি এবং জাতীয় নিরাপত্তা—তিনটিকেই দুর্বল করতে পারে।
এর পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসের উচিত প্রতিরক্ষা বাজেট কমানোর পাশাপাশি বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ও সামরিক অঙ্গীকারও সীমিত করা।
এতে ব্যয়বহুল সংঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক দায়বদ্ধতা এড়ানো সম্ভব হবে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শক্তি আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
কারণ একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কোনো সংঘাত দেখা দিলে অস্ত্র তৈরির জন্য যেমন অর্থের প্রয়োজন, তেমনি সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ দ্রুত পরিবহনের জন্য উন্নত সড়ক, রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামোরও প্রয়োজন হয়।
তাই অপ্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উচিত দেশের অর্থনৈতিক ভিত শক্তিশালী করা এবং জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী ২৩ আগস্ট : উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথিকৃত শফিকুল গানি স্বপন
সঙ্গীত একাডেমি