১৮ জুলাই ২০২৬

সিনেমার সুযোগ দেখিয়ে অভিনেত্রীকে ডেকে নিয়ে হত্যা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৩২ পিএম
সিনেমার সুযোগ দেখিয়ে অভিনেত্রীকে ডেকে নিয়ে হত্যা

বাংলাপ্রেস ডেস্ক: বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মীনাক্ষী থাপা। অভিনয়ের সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এই তরুণ অভিনেত্রীর সামনে তখনো বড় সাফল্যের দরজা খোলেনি। কিন্তু যে স্বপ্নের শহরে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজতে গিয়েছিলেন, সেখানেই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছিল।

২০১২ সালের মার্চে নিখোঁজ হন ২৬ বছর বয়সি মীনাক্ষী। পরে জানা যায়, একটি ভুয়া সিনেমার প্রস্তাবের ফাঁদে ফেলে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। আর এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলিউডেরই দুই জুনিয়র শিল্পী, যাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল সিনেমার সেটে। 

মীনাক্ষীর মৃত্যুর ঘটনা আজও বলিউডের অন্যতম আলোচিত ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ, এতে উঠে এসেছিল বিনোদনজগতের নতুনদের সংগ্রাম, কাজ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার নির্মম চিত্র। 

সেটে পরিচয়, পরে তৈরি হয় ফাঁদ

উত্তরাখন্ডের দেরাদুন থেকে মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মীনাক্ষী। বড় পর্দায় নিজের পরিচিতি তৈরি করাই ছিল তার স্বপ্ন। তিনি এর আগে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘৪০৪’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। পরে পরিচালক মাধুর ভান্ডারকারের ‘হিরোইন’ ছবিতেও কাজের সুযোগ পান। কারিনা কাপুর অভিনীত ওই ছবির সেটেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় জুনিয়র আর্টিস্ট অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনের। 

পুলিশের তদন্ত ও আদালতের নথি অনুযায়ী, অমিত ও প্রীতি মীনাক্ষীর সঙ্গে পরিচয়ের পর তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন। তারা ধারণা করেছিলেন, মীনাক্ষীর পরিবার বেশ অর্থশালী। সেই ভুল ধারণা থেকেই তারা তাকে অপহরণের পরিকল্পনা করেন।

অভিনয়ের সুযোগের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তর প্রদেশে

অভিনয়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা মীনাক্ষী ওই প্রস্তাবে বিশ্বাস করেছিলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাকে বলেছিলেন, উত্তর প্রদেশে একটি সিনেমায় কাজের সুযোগ রয়েছে। নতুন অভিনেত্রী হিসেবে মীনাক্ষীর কাছে এটি ছিল বড় সুযোগ পাওয়ার একটি সম্ভাবনা। 

২০১২ সালের ১৩ মার্চ অমিত ও প্রীতির সঙ্গে উত্তর প্রদেশের উদ্দেশে রওনা দেন মীনাক্ষী। গন্তব্য ছিল প্রয়াগরাজ।

কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফোন ধরছিলেন না মীনাক্ষী। উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তার পরিবার।

মুক্তিপণ দাবি, দেওয়া হয় ভয়ংকর হুমকি

ঘটনার কয়েক দিন পর, ১৭ মার্চ মীনাক্ষীর পরিবারের কাছে অজ্ঞাত নম্বর থেকে একটি বার্তা আসে। সেখানে ১৫ লাখ রুপি মুক্তিপণ দাবি করা হয়। শুধু টাকা দাবিই নয়, পরিবারকে ভয় দেখাতে আরও ভয়ংকর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, টাকা না দিলে মীনাক্ষীকে পর্নোগ্রাফিক ছবিতে কাজ করতে বাধ্য করা হবে।

পরিবারের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তারা মীনাক্ষীর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার রুপি জমা করেছিলেন। কিন্তু সেই অর্থ তাকে বাঁচাতে পারেনি। 

হত্যা, দেহ গুম এবং তদন্তের মোড়

তদন্তকারীদের দাবি, মুক্তিপণের টাকা না পাওয়ার পর অমিত ও প্রীতি মীনাক্ষীকে হত্যা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে শ্বাস রোধ করে হত্যার পর দেহ খণ্ডিত করা হয়। মীনাক্ষীর মাথাবিহীন দেহ প্রীতির পরিবারের বাড়ির কাছের একটি সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তার বিচ্ছিন্ন মাথা একটি বাসে করে লখনৌ যাওয়ার পথে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। তবে সেটি আর কখনো উদ্ধার করা যায়নি।

সিম কার্ড ও ডেবিট কার্ডেই ধরা পড়ে অভিযুক্তরা

হত্যার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মীনাক্ষীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দাবি করতে থাকে। কিন্তু তদন্তে একটি ভুল করে বসেন তারা। তারা মীনাক্ষীর সিম কার্ড নিজেদের কাছে রেখে দেন এবং তার ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার চেষ্টা করেন। পুলিশ ফোন রেকর্ড ও ইলেকট্রনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করতে শুরু করে। ২০১২ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রা স্টেশনের কাছে একটি এটিএমে অভিযানের পরিকল্পনা করে পুলিশ।

সেখানে যাওয়ার পরই অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে মীনাক্ষীর সিম কার্ড ও ডেবিট কার্ড পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানায়। দুই দিন পর, ১৬ এপ্রিল সেপটিক ট্যাংক থেকে মীনাক্ষীর দেহ উদ্ধার করা হয়। 

ছয় বছর পর আসে আদালতের রায়

এই মামলার বিচার শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ছয় বছর। ২০১৮ সালের ৯ মে মুম্বাইয়ের একটি আদালত অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনকে হত্যা এবং মুক্তিপণের জন্য অপহরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। বিশেষ সরকারি আইনজীবী উজ্জ্বল নিকম এ ঘটনাকে ‘বিরলতম অপরাধ’ উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত দুজনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেন।

মীনাক্ষী থাপা মুম্বাইয়ে এসেছিলেন একটি সুযোগের অপেক্ষায়। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, একটি ভালো চরিত্র তার জীবন বদলে দিতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগের প্রতিশ্রুতিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল তার মৃত্যুর কারণ, যে প্রস্তাবের পেছনে ছিল না কোনো সিনেমা, ছিল শুধু একটি ভয়ংকর অপরাধের পরিকল্পনা। সূত্র: যুগান্তর

বিপি>টিডি

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি