সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: সৌদি আরবের মক্কায় বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলাম আবদুল বাছিরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামে। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা-মা। অন্যদিকে, ভাতিজার মৃত্যুর খবর শুনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। পরপর দুই স্বজনকে হারিয়ে শোকাহত পরিবারটি এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাচ্ছে। নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বাছিরের ছেলে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির। তিনি বলেন, তারা স্বামী-স্ত্রী নন। সুইটি আক্তারকে তারা চেনেন না।
আব্দুল বাছির বলেন, ‘ছেলেকে কলেজে পড়ার সময় পরিবারের হাল ধরতে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। সে বিয়ে করল কখন? ওই মেয়ে নজরুলের স্ত্রী নয়, তাকে আমরা চিনিও না। শুনেছি, তারা একই জায়গায় কাজ করত।’
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পরিবার জানতে পারে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে। স্বজনদের অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের কিছুই জানানো হয়নি। এমনকি নজরুলের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় তিনি যথাযথ আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়েও পরিবার অন্ধকারে রয়েছে।
সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন সৌদি আরবে
নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সাত লাখ টাকা ঋণ করে তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ২০ বছর।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় থেকে আট মাস পর নজরুলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে ফোন করে তিনি জানান, তিনি বন্দি রয়েছেন। তবে কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত জানানো হয়নি বলে দাবি স্বজনদের।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে পরিবার গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারে।
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে মারা গেলেন ফুফু
নজরুলের মৃত্যুর খবর জানার পর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন তাঁর ফুফু আবেদা বেগম। ওই দিন রাতেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
একদিকে বড় ছেলেকে হারানোর শোক, অন্যদিকে বোনের মৃত্যু—পরপর দুই আঘাতে ভেঙে পড়েছেন নজরুলের বাবা আবদুল বাছির। পরিবারের উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে নেওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ।
আবদুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলেও গেল, বোনও গেল। সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলাম। এখন কীভাবে এই ঋণ শোধ করব, তাও জানি না। সরকারের কাছে দাবি, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’
মৃত্যুদণ্ডের আগে আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন নজরুল?
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তিনি যথাযথ আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর বাবা। আবদুল বাছিরের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকার সময় নজরুল তাঁকে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল কনস্যুলারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না কিংবা তাঁর পক্ষে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পরিবার নিশ্চিত নয়।
পরিবারের অভিযোগ, নজরুলের গ্রেপ্তার, বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। এ কারণে পুরো ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে এবং ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চাইছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানিয়েছেন, নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে নিয়ম অনুযায়ী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দারাও শোক প্রকাশ করছেন। প্রতিবেশীরা নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং সমবেদনা জানাচ্ছেন।
প্রবাসে গিয়ে পরিবারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন নজরুল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর খবরে এখন শোক, ঋণ আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারের। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরে শেষবারের মতো দেখতে চান তাঁর বাবা-মা।
বিপি/কেজে
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের কর্ণধার দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিবরণ
সঙ্গীত একাডেমি