১০ দিনে চার নির্বাচনে ধাক্কা খেল ইসরায়েল, মিত্র হারিয়ে বাড়ছে কূটনৈতিক সংকট
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে চারটি নির্বাচনে পরাজয়ের মুখে পড়েছে ইসরায়েল। এর মধ্যে একটি ছিল দেশটির নিজস্ব নির্বাচন। বাকি তিনটি নির্বাচনের ফলাফলও ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সার্বিয়া, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ার নির্বাচন দিয়ে ইসরায়েলের পরাজয়ের এই ধারার শুরু। দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের সমর্থিত একটি নির্বাচনী জোটের কাছে তার জোট পরাজিত হয়।
ভুচিচ ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর পশ্চিমা কয়েকটি দেশ অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করলেও সার্বিয়া ইসরায়েলকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে সহযোগিতা করে। হামলার পরদিনই গোলাবারুদ চেয়ে সার্বিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ইসরায়েল। এরপর দেশটি বিমানযোগে ইসরায়েলে ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা পাঠাতে শুরু করে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুচিচের সঙ্গে ফোনালাপের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে ‘ইসরায়েলের প্রকৃত বন্ধু’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সার্বিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও ছিল বেশ শক্তিশালী।
২০২৫ সালের আগস্টে সার্বিয়া ইসরায়েলের কাছ থেকে ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ১৬০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। পরে বেলগ্রেডে ইসরায়েলি নকশার ড্রোন সংযোজনের কারখানাও উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু নির্বাচনে ভুচিচের জোটের পরাজয়ে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ, বিজয়ী শিক্ষার্থী-সমর্থিত জোট যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের অঙ্গীকার করেছে।
এরপর ব্রাজিলের নির্বাচনেও ধাক্কা খায় ইসরায়েল। দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন। ইসরায়েল আশা করেছিল, বলসোনারো জয়ী হলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। কিন্তু লুলার পুনর্নির্বাচনে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে।
এর আগে, ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদার করেছিলেন। জাতিসংঘেও ইসরায়েলের পক্ষে ব্রাজিলের অবস্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে লুলা ক্ষমতায় ফিরে ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে হলোকাস্টের সঙ্গে তুলনা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলার প্রতিও সমর্থন জানায় ব্রাজিল। ইসরায়েলে নিযুক্ত নিজেদের রাষ্ট্রদূতকেও প্রত্যাহার করে নেয় দেশটি।
বিদেশে একের পর এক ধাক্কার পর নিজেদের নির্বাচনেও স্পষ্ট বিজয়ী পায়নি ইসরায়েল। নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার দাবি তুলেছে। ফলে দেশটিতে আবারও রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচটি নির্বাচন আয়োজনের পর ইসরায়েল যে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছিল, নতুন ফলাফল সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। জোট সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ দর-কষাকষি শুরু হলে দেশটির প্রশাসনিক কার্যক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত মিশিগানের আবদুল এল-সায়েদও।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া, অস্ত্র বিক্রি এবং দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক বাড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের সমর্থনও আগের তুলনায় শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু ডেমোক্র্যাটরাই নয়, রিপাবলিকানদের মধ্যেও নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করা কিছু ভোটার এবার ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে ইরানের যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনের মতো বিষয় কাজ করেছে।
ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্রদের নির্বাচনী পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা নেতানিয়াহু সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেস আগামী ৩ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এর আগেই ইসরায়েলকে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে হবে। অন্যথায় ওয়াশিংটনের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে দেশটিকে আরও বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট
বিপি/টিআই
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
ইরানকে হয়তো ধ্বংস করে দিতে হবে, শিগগিরই জানতে পারবেন: ট্রাম্প
ব্যাংক ধসের জেরে ৩০ লাখ গ্রাহকের অর্থ আটকে, পদত্যাগ প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের
সঙ্গীত একাডেমি