ঈদে বেড়েছে ডিজিটাল সালামি: প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলাচ্ছে ঐতিহ্য
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: ঈদুল ফিতর মানেই আনন্দ, মিলনমেলা এবং ছোটদের জন্য অধীর অপেক্ষার একটি মুহূর্ত— সালামি পাওয়া। বহুদিন ধরে আমাদের সমাজে ঈদের দিন ছোটরা বড়দের সালাম করে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে কিছু অর্থ বা উপহার পেয়ে থাকে। এই ঐতিহ্যবাহী রীতিই পরিচিত ‘ঈদ সালামি’ বা আরবি ভাষায় ‘ঈদিয়া’ নামে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে এই সালামি দেওয়ার ধরনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সরাসরি নগদ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল সালামি’ দেওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। অনেকেই এখন ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস, মেসেঞ্জার বার্তা কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বড়দের কাছে সালামি চাইছেন। আবার বড়রাও বিকাশ, রকেট, নগদ বা উপায়সহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে মুহূর্তেই সালামি পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
প্রযুক্তির প্রভাবে বদলাচ্ছে সালামির ধরন
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির বিস্তার এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতার কারণে এখন দূরে থেকেও খুব সহজে সালামি দেওয়া–নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আগে প্রবাসে থাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সালামি পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে মুহূর্তেই অর্থ পাঠানো সম্ভব হওয়ায় দূরত্ব অনেকটাই কমে গেছে।
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার যাত্রা শুরু হয় ২০১০-১১ সালের দিকে। শুরুতে এর ব্যবহার সীমিত থাকলেও ২০১৫ সালের পর থেকে তা দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় ডিজিটাল লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই সময় থেকেই অনেক সামাজিক ও পারিবারিক অর্থ লেনদেনে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়, যার প্রভাব এখন ঈদের সালামিতেও স্পষ্ট।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান বলেন, “ডিজিটাল সালামি এখন অনেক সহজ এবং নিরাপদ। দূরে থাকলেও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে মুহূর্তেই সালামি পাওয়া যায়। তবে আগে নতুন টাকার যে গন্ধ আর অনুভূতি ছিল, সেটা এখন আর তেমন পাওয়া যায় না।”
নতুন টাকার সংকট ও বিকল্প ব্যবস্থা
ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই নতুন নোটের চাহিদা বেড়ে যায়। ছোটদের সালামি দেওয়ার জন্য অনেকেই নতুন কড়কড়ে নোট সংগ্রহ করতে পছন্দ করেন। তবে এবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঈদ উপলক্ষে নতুন নোট বাজারে ছাড়েনি। ফলে বাজারে নতুন টাকার সংকট তৈরি হয়েছে এবং ফুটপাতে নতুন নোটের বেচাকেনা বেড়ে গেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিবছর নতুন নোট ছাপাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এই বিপুল ব্যয় কমানো এবং ধীরে ধীরে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার নীতির অংশ হিসেবে নতুন নোটের সরবরাহ কমানো হয়েছে। তবে ঈদকে ঘিরে নতুন নোটের চাহিদা কমেনি। ফলে সরবরাহের ঘাটতির সুযোগে খোলা বাজারে নতুন নোটের বেচাকেনা বেড়ে থাকতে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ১০ টাকার নতুন নোটের এক হাজার টাকার বান্ডিল কিনতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ টাকা দিতে হয়েছে। ২০ টাকার দুই হাজার টাকার বান্ডিলের জন্য অতিরিক্ত দিতে হয়েছে প্রায় ৬৫০ টাকা। এমনকি পুরোনো নোটের ক্ষেত্রেও প্রতি বান্ডিলে প্রায় ৪০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে। আর ১০০ টাকার বান্ডিলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।
সালামি আদায়ে নতুন কৌশল
ঈদে সালামি পাওয়ার জন্য তরুণদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মজার কৌশলও দেখা যায়। অনেকেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে সালাম করেন, আবার কেউ ঈদের নামাজ শেষে বড়দের সঙ্গে দেখা করে সালামি চান। অনেক ক্ষেত্রে কিশোর ও তরুণরা দলবদ্ধভাবে আত্মীয় বা পাড়ার বড়দের কাছে গিয়ে সালামি সংগ্রহ করেন।
অফিস সংস্কৃতিতেও সালামি আদায়ের একটি আলাদা রীতি রয়েছে। ঈদের ছুটি শুরুর আগে শেষ কর্মদিবসে কনিষ্ঠ সহকর্মীরা দল বেঁধে অগ্রজদের কাছ থেকে সালামি আদায় করেন। এতে কর্মক্ষেত্রেও উৎসবের আনন্দ তৈরি হয়।
নতুন ট্রেন্ড: টাকার ‘সালামি তোড়া’
ঈদের সালামির ঐতিহ্যবাহী রীতিতে এখন যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন মাত্রা— টাকার নোট দিয়ে তৈরি ‘সালামি তোড়া’। হাতে টাকা গুঁজে দেওয়ার বদলে অনেকেই এখন টাকার নোট দিয়ে সাজানো ফুলের তোড়া বা উপহার তৈরি করে সালামি দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে জনপ্রিয় হওয়া এই ট্রেন্ড ঘিরে অনলাইনভিত্তিক ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজারও তৈরি হয়েছে।
অনলাইন ক্রাফটিং উদ্যোক্তা ইসমত আরা জানান, তিনি ২০২১ সালে ‘Ara’s Flair’ নামে একটি অনলাইন পেজের মাধ্যমে এই ধরনের কাজ শুরু করেন। ২০২৩ সালে প্রথমবার এক প্রবাসী গ্রাহকের অনুরোধে টাকার নোট দিয়ে ফুলের তোড়া তৈরি করেন।
তিনি বলেন, “শুরুর দিকে এই ধারণাটি খুব বেশি পরিচিত ছিল না। তবে ২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই এই ধরনের তোড়া বানাতে শুরু করেন। এখন ঈদকে সামনে রেখে অর্ডারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।”
উদ্যোক্তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে সালামি তোড়া তৈরির মেকিং চার্জ ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। টাকার পরিমাণ, নোটের সংখ্যা এবং সাজসজ্জার ধরন অনুযায়ী খরচ বাড়ে বা কমে।
বিশ্লেষকদের মতে, অল্প পুঁজি দিয়ে এই ধরনের কাজ শুরু করা সম্ভব হওয়ায় এটি তরুণ উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী এবং গৃহিণীদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগও তৈরি করছে।
ইতিহাসে ঈদিয়ার সূচনা
ঈদের দিনে উপহার দেওয়ার প্রথা নতুন নয়, এর শিকড় ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। গবেষকদের মতে, ‘ঈদিয়া’ শব্দটি এসেছে ‘ঈদ’ শব্দ থেকে, যার অর্থ আনন্দের উপলক্ষ্যে দেওয়া উপহার। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ঈদের দিনে উপহার দেওয়ার প্রচলন বিশেষভাবে দেখা যায় মিসরের ফাতেমীয় আমলে, অর্থাৎ হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে বা খ্রিষ্টীয় দশম শতকে।
সে সময় শাসকরা ঈদের দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থ ও কাপড় বিতরণ করতেন। রাজপরিবারের সদস্যদের দেওয়া হতো স্বর্ণমুদ্রা বা দিনার, আর শিশুদের দেওয়া হতো ছোটখাটো উপহার। ধীরে ধীরে এই প্রথা মুসলিম সমাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিতে পরিণত হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
আলেমরা বলছেন, ঈদ সালামি ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে এটি কোনও ইবাদত বা বাধ্যতামূলক বিধানও নয়। বরং এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথা।
রাজধানীর জামিয়াতুল ইসলামিয়া বায়তুস সালামের ফতোয়া বিভাগীয় প্রধান মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনী বলেন, ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী কোনো কাজ ততক্ষণ বৈধ, যতক্ষণ তা শরিয়তের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার মধ্যে না পড়ে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদের দিনে কাউকে খুশি করার উদ্দেশ্যে অর্থ বা উপহার দেওয়া বৈধ।
তিনি বলেন, হাদিসে উপহার আদান-প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তাই ছোটদের আনন্দ দেওয়া এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে ঈদ সালামি দেওয়া একটি সুন্দর উদ্যোগ হতে পারে।
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহও এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ঈদের সময় ছোটরা বড়দের সালাম দিলে বড়রা তার জবাব দেন এবং অনেক সময় ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে কিছু হাদিয়া দেন। এটি আমাদের দেশের সংস্কৃতির অংশ এবং ইসলামের সঙ্গে এর কোনো সংঘর্ষ নেই।
ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির সহাবস্থান
বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সামাজিক রীতির প্রকাশভঙ্গি বদলানো স্বাভাবিক। প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে, ফলে অনেক ঐতিহ্যবাহী রীতিতেও নতুন রূপ যুক্ত হচ্ছে। তবে ঈদ সালামির মূল উদ্দেশ্য— বড়দের স্নেহ ও ছোটদের আনন্দ ভাগাভাগি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে।
এক সময় নতুন টাকার খসখসে নোট হাতে পাওয়ার আনন্দই ছিল ঈদের সালামির প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু এখন ডিজিটাল লেনদেনের যুগে সেই অনুভূতির জায়গা কিছুটা বদলালেও সম্পর্কের উষ্ণতা এবং আনন্দ ভাগাভাগির ঐতিহ্য এখনও অটুট রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সালামির ধরন বদলাচ্ছে— নগদ টাকা থেকে মোবাইল ব্যাংকিং, আবার টাকার তোড়া পর্যন্ত। কিন্তু ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য এখনও একই জায়গায়—প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা এবং ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা।
বিপি/কেজে
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি