ফোবানার মঞ্চে আমার বিশ বছরের সুরযাত্রা
ফোবানার মঞ্চে আমার বিশ বছরের সুরযাত্রা
কৌশলী ইমা
একজন শিল্পীর জীবনে কিছু মঞ্চ থাকে, যেখানে গান গাওয়া শুধু পরিবেশনা নয়—একটি আত্মিক অনুভূতি। আমার কাছে ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা)-র মঞ্চ ঠিক তেমনই একটি আবেগের নাম।
আমার ফোবানা-যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ফোবানা সম্মেলনে। তখন আমি ভাবিনি, এই একটি মঞ্চই আমাকে পরবর্তী দুই দশক ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এত কাছাকাছি নিয়ে আসবে। আটলান্টার সেই ফোবানার মঞ্চে প্রথম পরিবেশনার কথা থাকলেও সময়ের শত্রুতার ফলে তা সম্ভব হয়নি। দিনটি আজও আমার চোখে ভাসে। সেইদিন মঞ্চে গাইতে না পারলেও নতুন শিল্পী হিসেবে কিছুটা শঙ্কা ছিল, আবার ছিল অপরিসীম ভালোবাসা পাওয়ার প্রত্যাশা। দর্শকদের আন্তরিক অভ্যর্থনা আমার সমস্ত দ্বিধা দূর করে দিয়েছিল।
তারপর কেটে গেছে প্রায় বিশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত অধিকাংশ ফোবানা সম্মেলনে গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। কখনো লালনের গান, কখনো লোকগীতি, কখনো দেশাত্মবোধক গান, আবার কখনো নিজের মৌলিক সৃষ্টি প্রতিটি পরিবেশনাই ছিল আমার শিল্পীজীবনের এক একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
ফোবানার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি শুধু গান গাইনি; আমি দেখেছি হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির চোখের ভাষা। দেখেছি মাতৃভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও কী গভীর ভালোবাসায় মানুষ বাংলা ভাষা, বাংলা গান ও বাংলা সংস্কৃতিকে বুকে আগলে রাখেন। আমার গান শেষ হওয়ার পর যখন কোনো প্রবীণ এসে বলেন, "আজ গ্রামের কথা মনে পড়ে গেল," কিংবা কোনো তরুণ এসে বলে, "আপনার গান শুনে বাংলার প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল"—তখন মনে হয়, একজন শিল্পী হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!
ফোবানা আমার কাছে কেবল একটি সম্মেলন নয়। এটি উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয়ের উৎসব। এখানে ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে, সংস্কৃতি আছে, আছে প্রজন্মের মিলন। এখানেই আমি উপলব্ধি করেছি—গানেরও একটি সামাজিক দায়িত্ব আছে। একটি গান মানুষকে যেমন আনন্দ দিতে পারে, তেমনি তাকে নিজের শেকড়ের কথাও মনে করিয়ে দিতে পারে।
এই উপলব্ধি থেকেই বহুদিন ধরে আমার মনে একটি স্বপ্ন ছিল—ফোবানাকে নিয়ে একটি মৌলিক গান গাইব। বহু সম্মেলনে অংশ নিয়ে সেই স্বপ্ন আরও গভীর হয়েছে। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
সাংবাদিক, লেখক ও গীতিকার ছাবেদ সাথী-র লেখা ও সুরে সম্প্রতি আমি একটি নতুন গান রেকর্ড করেছি, যার প্রতিটি পংক্তিতে ফুটে উঠেছে ফোবানার প্রাণস্পন্দন—
'ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিনোদন,
খুশিতে ভরে প্রবাসীদের মনপ্রাণ,
দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকি মহা মিলনমেলায়,
আমাদের ফোবানায়।'
এই কয়েকটি পংক্তিই যেন আমার বিশ বছরের অনুভূতির সারাংশ। ফোবানার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি অসংখ্যবার দেখেছি—মানুষ কয়েক দিনের জন্য হলেও প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি ও দুঃখ ভুলে যায়। সবাই এক হয়ে যায় একটি পরিচয়ে—আমরা বাংলাদেশি।
আমার শিল্পীজীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ছিল ২০১৫ সালে কিংবদন্তি কবি হেলাল হাফিজ-এর বিখ্যাত কবিতা 'নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়' গানে রূপ দিয়ে পরিবেশন করা। 'এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'—এই পংক্তি গাওয়ার সময় আমি অনুভব করেছি, একটি কবিতা কীভাবে গানের মাধ্যমে নতুন জীবন পেতে পারে। সেই পরিবেশনা আমার শিল্পীজীবনের একটি মাইলফলক হয়ে আছে।
আমি বিশ্বাস করি, ফোবানাকে উৎসর্গ করে রচিত এই নতুন গানটিও আমার শিল্পীজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ এটি শুধু একটি গান নয়; এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মিলিত আবেগ, ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি।
আমার শিল্পীজীবনের শুরু বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে। পরে ঢাকা সরকারি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় থেকে লোকসঙ্গীতে স্নাতক এবং বাংলা সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা আমাকে গানকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায়, দুর্নীতি, মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, মানবতা ও আধ্যাত্মিকতা—এসব বিষয় নিয়ে গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি সবসময়। কারণ আমি বিশ্বাস করি, গান শুধু বিনোদনের জন্য নয়; গান সমাজেরও আয়না।
আজ যখন ফোবানা চল্লিশ বছরে পদার্পণ করেছে, তখন আমার একটাই প্রার্থনা—এই সংগঠন আরও শক্তিশালী হোক, আরও ঐক্যবদ্ধ হোক। নতুন প্রজন্ম বাংলার গান, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হোক। আর আমার এই ছোট্ট গানটি যদি কোনো প্রবাসীর মনে নিজের দেশকে আরেকবার মনে করিয়ে দেয়, যদি কোনো তরুণের হৃদয়ে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি নতুন ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে, তাহলেই একজন শিল্পী হিসেবে আমার শ্রম সার্থক হবে।
ফোবানা আমার কাছে একটি মঞ্চের নাম নয়; এটি আমার বিশ বছরের গান, স্মৃতি, ভালোবাসা এবং প্রবাসজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৩ আগস্ট : সততা আর মেধাবী রাজনীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত আনোয়ার জাহিদ
সঙ্গীত একাডেমি