কাতার-কুয়েত-বাহরাইনকেও টেক্কা দিচ্ছে বাংলাদেশের বাজেট
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতিতে যেকোনো দেশের সক্ষমতা পরিমাপের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি দেশের সরকার বছরে কত অর্থ ব্যয় করবে, কীভাবে রাজস্ব আদায় করবে, কী পরিমাণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং জনগণকে কত ধরনের সেবা দেবে-তার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায় বাজেট থেকে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী এই বাজেটের আন্তর্জাতিক মূল্যমান দাঁড়ায় প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭৬ দশমিক ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের বাজেটের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।
বাজেটের আকার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কাতারের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও বাংলাদেশের বাজেট বড়। কাতার বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর একটি হলেও দেশটির জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে কাতারের সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে কম। একইভাবে তেলসমৃদ্ধ কুয়েতের বাজেটও বাংলাদেশের তুলনায় ছোট। ওমানের বাজেটের চেয়েও বাংলাদেশের বাজেট উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে বড়।
গত বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেট প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৬ হাজার বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের প্রায় সাড়ে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা সাড়ে চার হাজার বিলিয়ন ডলার। চতুর্থ অর্থনীতির দেশ ভারতের প্রায় ৬২০ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের চিরবৈরি পাকিস্তানের বাজেট প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার।
সেই তুলনায় গত বছর বাংলাদেশের ৬৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বাজেট বিশ্ব র্যাংকিংয়ে আনুমানিক ৫০তম থেকে ৫৫তম স্থানের মধ্যে পড়ে। তবে বাংলাদেশের বাজেট এখন মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের অনেক ধনী দেশের চেয়ে আকারে বড়।
ইউরোপীয় দেশ হাঙ্গেরির বাজেট বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা ছোট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটির বাজেট ছিল প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার। স্লোভাকিয়ার বাজেটের চেয়ে বাংলাদেশের বাজেট প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বড়। বুলগেরিয়ার চেয়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার, ক্রোয়েশিয়ার চেয়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বেশি। এছাড়া লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্টোনিয়ার মোট বাজেটের চেয়ে বাংলাদেশের বাজেট খানিকটা বড়।
গত বছর দেখা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ধনী কাতারের বাজেটের চেয়ে বাংলাদেশের বাজেট ৬ বিলিয়ন ডলার বেশি।
বাহরাইনের বাজেটের চেয়ে বাংলাদেশের বাজেট প্রায় ছয় গুণ বড়। ওমানের বাজেটের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বড় বাংলাদেশের বাজেট। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কুয়েতের বাজেটের চেয়ে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার বড় ছিল কৃষি-তৈরি পোশাক শিল্প-প্রবাসী আয়নির্ভর বাংলাদেশের বাজেট। তবে এই দেশগুলোতে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশির চেয়ে অনেক বেশি হলেও, তাদের জনসংখ্যা কম হওয়ায় জাতীয় বাজেটের আকার বাংলাদেশের চেয়ে ছোট।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন মধ্যম আয়ের পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়, প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীল প্রবাহ এবং শিল্প খাতের সম্প্রসারণ বাজেটকে বড় করার মূল চালিকাশক্তি। জনসংখ্যাভিত্তিক বৃহৎ অর্থনৈতিক কাঠামো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের প্রসারও বাজেট আকার বাড়াচ্ছে।
একসময় যেসব ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশকে আর্থিক সক্ষমতার প্রতীক মনে করা হতো, বাংলাদেশের বাজেট আজ অনেক ক্ষেত্রে তাদের অতিক্রম করেছে। এ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নবউত্থানের ইঙ্গিত বহন করে।
প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মাঝারি মাপের বাজেট হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক ঋণ ও ঘাটতি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এই বাজেট একটি স্থিতিশীল, রূপান্তরমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রশ্ন হতে পারে, মাথাপিছু আয় ও জীবনমানের বিচারে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ কীভাবে এসব ধনী দেশের চেয়ে বড় বাজেট প্রণয়ন করছে?
এর প্রধান কারণ জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি। বিপরীতে কাতার, কুয়েত ও ওমানের সম্মিলিত জনসংখ্যাও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। অধিক জনসংখ্যার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি সেবায় বিপুল ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। ফলে জাতীয় বাজেটও বড় হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাজেটকে ডলারে রূপান্তর করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, উন্নয়নশীল এই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি এখন কতটা বিস্তৃত হয়েছে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান কোথায় পৌঁছেছে।
বিপি/টিআই
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
বাড়বে সিগারেটের দাম, অবৈধ সিগারেটের তথ্যদাতাকে দেয়া হবে পুরস্কার
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব
ফ্যামিলি কার্ডে বিশাল বরাদ্দ, ভাতা বাড়ছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের
সঙ্গীত একাডেমি