৪ জুন ২০২৬

খেলার মাঠ হারিয়ে শিশুদের দুনিয়া এখন মুঠোফোনে

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
খেলার মাঠ হারিয়ে শিশুদের দুনিয়া এখন মুঠোফোনে

শিশুদের খেলার মাঠও এখন দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

ছাবেদ সাথী

শহরের শিশুদের খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। গ্রামের শিশুদের খেলার মাঠও দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে এখন শিশুদের অবসর ও সময় কাটানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে মুঠোফোন। এই সমস্যার সমাধানের জন্য জাতীয় ও সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে; নইলে সমস্যা দিন দিন আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ৮৫ হাজারের বেশি বিদ্যালয় রয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে কয়েক হাজার স্বতন্ত্র কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। অধিকাংশ স্কুলেই দুই শিফটে ক্লাস হয় কিংবা এক শিফটে ক্লাস, অন্য শিফটে কোচিং চলে। ফলে স্কুলে খেলার মাঠ থাকলেও প্রায় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। আবার অনেক স্কুলেই ছুটির পর শিক্ষার্থীদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। স্কুল টাইমে টিফিন বিরতিও এত অল্প থাকে যে তখন আর খেলার সময় থাকে না।  সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সংবাদ হয়তো অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। ঢাকার একটি সেমিনারের তথ্য তুলে ধরে সংবাদে বলা হয়েছে, দেশের ১০ হাজার ৭৪০টি স্কুলে কোনো খেলার মাঠ নেই। মাঠের অভাবে শিশুরা মুঠোফোনসহ অন্যান্য ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে পারছে না। এর ফলে শিশুরা একরকম মানসিক বৈকল্য নিয়ে বেড়ে উঠছে। সংবাদটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, খেলার মাঠের অভাব শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

তা ছাড়া এটাও সত্যি, শিক্ষার্থীর খেলা বা অবসরের সময়ও কমে এসেছে। একজন শিক্ষার্থী সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, এমনটা মনে করেন অভিভাবকেরাও। শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন রুটিন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাকে সারাক্ষণ পড়ার মধ্যেই থাকতে হয়, খেলার সময় সে আর পায় না। স্কুলে যাওয়ার আগে কিংবা ছুটির পরে তাকে হয় কোচিং-প্রাইভেটে ব্যস্ত থাকতে হয়, নইলে ক্লাসের পড়া শেষ করতে হয়। দিনের বেলা তার পক্ষে সময় বের করাই কঠিন, যখন সে কাছের বা দূরের কোনো মাঠে গিয়ে খেলতে পারে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষেরও ভাবার অবকাশ রয়েছে। আমাদের চিন্তা করা দরকার, আমরা ভবিষ্যতের জন্য কেমন প্রজন্ম দেখতে চাই।একসময় প্রতিটি স্কুলে ক্লাস শুরুর আগে মাঠে শিক্ষার্থীদের জমায়েত হতে হতো। সেখানে পিটি-প্যারেডের সুযোগ থাকত। কিন্তু মাঠের অভাবে অনেক স্কুলেই এ ধরনের পিটি-প্যারেড বা অ্যাসেম্বলি এখন হয় না। ঢাকার এবং বিভিন্ন জেলা শহরের অলিগলিতে এমন স্কুলও দেখা যায়, যেখানে সাজানো-গোছানো ক্লাসরুম আছে, কিন্তু কোনো মাঠ বা ফাঁকা জায়গা নেই। একটি ভবনের এক বা একাধিক ফ্ল্যাটে কয়েকটি ক্লাসরুম আর অফিস নিয়ে স্কুলের কার্যক্রম চলছে! 

নতুন স্কুল অনুমোদন দেওয়ার আগে কিছু চেকলিস্ট অত্যাবশ্যক করা দরকার, যেখানে খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক হবে। এমনকি যেসব স্কুলের কার্যক্রম চলছে, সেগুলোর ক্লাস রুটিনে সপ্তাহে একাধিক খেলার পিরিয়ড বা ঘণ্টা রাখতে হবে। স্কুলগুলোতে ফুটবল, ভলিবল, টেবিল টেনিস, দাবা, ক্যারমসহ বিভিন্ন রকম ইনডোর-আউটডোর গেমের ব্যবস্থা থাকবে। ছুটির পরও শিক্ষার্থীরা যাতে স্কুলের মাঠ ব্যবহার করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

২০২৪ সালে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই শিফটের স্কুলগুলোকে এক শিফটে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তখন সিদ্ধান্ত হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই শিফটে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে। দুই শিফটের অধীনে নতুন করে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এমপিওভুক্ত করা হবে না। এটি করা সম্ভব হলে শিক্ষকদের কাজের চাপ যেমন কমত, তেমনি শিক্ষার্থীরাও দিনের কিছু সময় স্কুলের মাঠে খেলাধুলা করতে পারত।খেলার মাঠের অভাব যেহেতু শহরগুলোতে প্রকট, সেহেতু সিটি করপোরেশনগুলোকেও ভূমিকা নিতে হবে। প্রতিটি এলাকায় উন্মুক্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা গেলে এলাকার শিশুসহ সব বয়সী মানুষ উপকৃত হবে। নতুন কোনো আবাসন প্রকল্প সরকারিভাবে অনুমোদন দেওয়ার আগে সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ খোলা জায়গা ও খেলার মাঠ আছে কি না, দেখা দরকার। বাড়িমালিক সমিতি এবং এলাকাবাসীরও কিছু দায়িত্ব আছে। এলাকায় পরিত্যক্ত মাঠ বা খোলা জায়গা থাকলে সেগুলোকে শিশুদের খেলার উপযোগী করে তুলতে হবে।

বর্তমানে শিশুরা নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। শিশুদের বিকাশের ঘাটতি যে কত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, সেটি বোঝা যায় বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে। স্কুলগুলোতেও শিক্ষার্থীরা আনন্দ হারাতে বসেছে। অতিরিক্ত বাড়ির কাজ, পরীক্ষা আর কোচিং-প্রাইভেট তাদের সৃজনশীল কাজের সময়ও কমিয়ে দিয়েছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তাদের বেড়ে ওঠা যে সুন্দর হতে পারে, সেটি সমাজের অংশীজনেরাও যেন ভুলতে বসেছেন। মোদ্দাকথা, আমরা শিশুদের শৈশবকে লুট করে নিয়েছি।শিশুদের জন্য বিকল্প হাজির করতে না পারার কারণে তারা মুঠোফোন ও অন্যান্য ডিভাইসে আসক্ত হচ্ছে। এর দরুন তাদের চোখেরও ক্ষতি হচ্ছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই রয়েছে নানা রকম সৃজনশীল ক্ষমতা। সেগুলো প্রকাশের সুযোগ করে দিতে স্কুলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বছরের একেক মাসে একেক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যায়। এভাবে একজনের কাজ দেখে অন্যরাও উদ্বুদ্ধ হবে। তা ছাড়া প্রতিটি স্কুলের গ্রন্থাগারকে সমৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে। ক্লাস রুটিনে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি বা দুটি ঘণ্টা রাখতে হবে, যাতে তারা গ্রন্থাগারে বসে বই বা পত্রিকা পড়তে পারে।

বর্তমানে শহর ও গ্রাম যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে শিশুদের খেলার মাঠ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। সুস্থ, উদ্যমী ও সৃজনশীল একটি প্রজন্ম চাইলে আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি