২৬ জুলাই ২০২৬

ক্রমবর্ধমান বিভক্তির মধ্যে অনিশ্চয়তার মুখে ফোবানা সম্মেলনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
ক্রমবর্ধমান বিভক্তির মধ্যে অনিশ্চয়তার মুখে ফোবানা সম্মেলনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য

৪০তম ফোবানা সম্মেলন

ছাবেদ সাথী
উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সবচেয়ে পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন্স ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা) একসময় ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের সর্ববৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমঞ্চ। বছরে একবার আয়োজিত ফোবানা সম্মেলনকে ঘিরে দেশ-বিদেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতাদের উপস্থিতিতে তৈরি হতো উৎসবের আমেজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক বিভাজন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে সেই ঐতিহ্য আজ প্রশ্নের মুখে।
কোভিড-১৯ মহামারির আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতৃত্বের বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে পরাজিত একটি অংশ পৃথক প্ল্যাটফর্ম গঠন করলে ফোবানার বিভক্তি আরও প্রকট হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে একাধিক সংগঠন নিজেদের ফোবানার উত্তরসূরি বা প্রকৃত প্রতিনিধি দাবি করে পৃথক সম্মেলনের আয়োজন করছে।
এ বছরও সেই চিত্রের ব্যতিক্রম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চারটি পৃথক সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আগামী ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক দিবসের (লেবার ডে) সপ্তাহান্তে ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সাল সিটির হিলটন লস অ্যাঞ্জেলেস হোটেলে অনুষ্ঠিতব্য ৪০তম ফোবানা সম্মেলনকে অনেক প্রবীণ সংগঠক ও সমর্থক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহনকারী মূল সম্মেলন হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যদিকে, অন্যান্য আয়োজকরাও নিজেদের উদ্যোগকে বৈধ ও প্রতিনিধিত্বশীল বলে দাবি করছেন।
ফোবানার ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, একসময় একটি মাত্র সম্মেলনকে কেন্দ্র করেই উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রায় সব সংগঠন একত্রিত হতো। সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ছিল নেতৃত্ব নির্বাচন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং, সাহিত্যসভা, তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।
কিন্তু বর্তমানে একই বছরে একাধিক সম্মেলনের আয়োজনের ফলে কমিউনিটির অংশগ্রহণ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শিল্পী, অতিথি, পৃষ্ঠপোষক ও স্পন্সরদেরও বিভিন্ন আয়োজনে ছড়িয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে কোনো একটি সম্মেলনই অতীতের মতো সর্বজনীন বা ব্যাপক অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করতে পারছে না।
কমিউনিটির অনেক প্রবীণ সদস্যের মতে, ফোবানার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর ঐক্য। এখন সেই ঐক্যের জায়গায় এসেছে প্রতিযোগিতা, পাল্টাপাল্টি দাবি এবং সাংগঠনিক বিভাজন। তাঁদের মতে, সম্মেলনের সংখ্যা বাড়লেও কমেছে সম্মেলনের প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব।
অন্যদিকে, বিভক্ত সংগঠনগুলোর সমর্থকদের যুক্তি হলো, নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিকল্প নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মতে, একাধিক আয়োজনের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বিভক্তির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফোবানা ব্র্যান্ড। একসময় যে সম্মেলনের জন্য বছরজুড়ে অপেক্ষা করতেন প্রবাসীরা, সেখানে এখন বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে—কোনটি প্রকৃত ফোবানা, কোনটি ধারাবাহিকতার অংশ এবং কোন সম্মেলনে কমিউনিটির সর্বাধিক প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
আরও একটি বড় সংকট হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকতা। করপোরেট স্পন্সর, কমিউনিটি ব্যবসায়ী এবং দাতারা এখন বিভিন্ন আয়োজনে ভাগ হয়ে যাওয়ায় কোনো একটি সম্মেলনই আগের মতো শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারছে না। এর প্রভাব পড়ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অতিথি আমন্ত্রণ, প্রকাশনা, গবেষণাধর্মী সেমিনার এবং তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগেও।
অনেকের মতে, এখনকার বেশিরভাগ সম্মেলন মূলত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। অথচ ফোবানার ঐতিহ্য ছিল এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত—এটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক সংহতি, নেতৃত্ব বিকাশ, সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ-উত্তর আমেরিকা সম্পর্ক জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
কমিউনিটির অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, ফোবানার হারানো ঐতিহ্য ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংলাপ, সমঝোতা এবং একটি গ্রহণযোগ্য সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় বিভক্তির এই ধারা অব্যাহত থাকলে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম বৃহৎ ঐতিহ্যবাহী প্ল্যাটফর্মটি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
প্রশ্নটি তাই এখন শুধু একটি সম্মেলনকে ঘিরে নয়; প্রশ্ন হলো-প্রবাসী বাংলাদেশিদের কয়েক দশকের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান কি আবারও এক ছাতার নিচে ফিরে এসে তার হারানো জৌলুস পুনরুদ্ধার করতে পারবে, নাকি বিভক্তির রাজনীতি তার ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে?

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক-বাংলা প্রেস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি, কানেকটিকাট


সঙ্গীত একাডেমি, কানেকটিকাট

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি