১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেকের সংবর্ধনা বাতিল: নেপথ্যে ‘তোলাবাজি নাকি সাশ্রয়’?

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেকের সংবর্ধনা বাতিল: নেপথ্যে ‘তোলাবাজি নাকি সাশ্রয়’?

নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেকের সংবর্ধনা বাতিল

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউ ইয়র্ক সফরের দিনক্ষণ ঘোষনার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা-কর্মীদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। নেতৃত্বের কোন্দলে জর্জরিত যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের জলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন খোকন। তিনি প্রায় দু'সপ্তাহ আগেই নিউ ইয়র্কে পৌঁছেই দল গোছাতে শুরু করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর মান অভিমান ভাঙাতে পারেননি অধিকাংশ নেতাকর্মীদের। ফলে আগের গোস্বা রয়েছে গেছে অনেকের মাঝে।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা-কর্মীদের পুর্বের অভিযোগ নিউ ইয়র্কসহ এক ডজন অঙ্গরাজ্যে তিনি অর্থের বিনিময়ে যেসব পকেট কমিটি তৈরি করেছেন সেসব অঙ্গরাজ্যগুলোতে একাই চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন নতুন প্রলোভন আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তারেক রহমানের নিউ ইয়র্কের সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে অর্থ সংগ্রহ করছেন বলে ফের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সুত্রে এসব খবর পৌঁছেছে ঢাকায় ফলে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল সেটি বাতিল করা হয়। তবে প্রায় ৫ কোটি টাকা সাশ্রয় করতেই অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে। যদিও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেতা-কর্মীরা।
দীর্ঘদিন পর দলের চেয়ারম্যান ও দেশের প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর হওয়ায় এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রদর্শনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতারা। তবে নেতৃত্বের কোন্দল মেটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন আনোয়ার হোসেন খোকন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে নেতৃত্বকারী বাংলাদেশের সরকার প্রধানদেরকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদানের রেওয়াজ চালু আছে নিউ ইয়র্কে। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে অনুষ্ঠেয় নাগরিক সংবর্ধনা নিয়ে বাংলাদেশি আমেরিকানদের মাঝে চলছে ব্যাপক আলোচনা। দীর্ঘ ২১ বছর পর মাতা খালেদা জিয়ার পর সম্মানিত হবেন তারেক রহমান। স্থানীয় বাংলাদেশি মিডিয়ার সাথেও বিভিন্ন সময় মিলিত হন দেশের সরকার প্রধানগণ। চলতি বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নি উইয়র্কে মিডিয়ার মুখোমুখি হবেন না বলে নিশ্চিত করেছে বিশ্বস্ত সূত্র।
এদিকে সংবর্ধনা আয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণও সামনে এসেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি না থাকায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে এ প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কারা আয়োজনে থাকবেন, কারা প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি থাকার সুযোগ পাবেন, কোন অঙ্গরাজ্য থেকে কতসংখ্যক নেতা-কর্মী আনা হবে—এসব বিষয়ও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। তাই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে যে টানাপোড়েন রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে সেটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগদান করতে নিউ ইয়র্ক যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নয় দিনের এক সফরে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক পৌঁছাবেন তিনি। সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন ২৪ সেপ্টেম্বর। ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোর উদ্দেশে ২৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ত্যাগ করবেন এবং সেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কয়েকজন বিশ্ব নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে তারেক রহমানের। এছাড়া এবারের অধিবেশন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ চার দশক পর বাংলাদেশের সভাপতিত্বে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তারেক রহমানের ভাষণ বাংলাদেশকে পৌঁছে দেবে ভিন্ন উচ্চতায়।
উল্লেখ্য, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করেন। এ সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে মিলিত হন তিনি। ম্যানহাটান ম্যারিয়ট মার্কিস হোটেলে এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন সাত শতাধিক আমন্ত্রিত বাংলাদেশি। নিউ ইয়র্ক কনসূলেট তত্ত্বাবধান করে পুরো অনুষ্ঠানটি। এতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ডলার ব্যয় হয় বলে জানা গেছে কনস্যুলেট সূত্রে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবর্ধনায় এবার এক হাজার প্রবাসীর অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের একটি বাজেট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে নিউ ইয়র্ক কনস্যুলেট। বাংলাদেশি টাকায় যা তিন কোটিরও অধিক। মোটা অংকের এই অর্থ ব্যয় করে অনুষ্ঠান না করার পক্ষে ইতিমধ্যেই মত দিয়েছেন তারেক রহমান। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতৃবৃন্দ দাবি জানিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার আয়োজক হওয়ার। এজন্য দলটির একজন শীর্ষ নেতা ঢাকা গিয়ে বিষয়টি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। তবে দলীয় ব্যানারে তারেক রহমান সংবর্ধনায় অংশ নেবেন কিনা—এ বিষয়টি স্পষ্ট করেননি কেউই। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কোনো কমিটি নেই ২০১১ সালের পর থেকে। নেতৃবৃন্দের ঐক্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে অর্থের সংকুলান কিভাবে হবে তা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি তারপরও দায়িত্ব গ্রহণে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। ম্যানহাটান ম্যারিয়ট মার্কিস হোটেল বুকিং দেয়া হয়েছে বলেও জানান দায়িত্বশীল একজন বিএনপি নেতা। সংবর্ধনার ব্যয়ভারও বহন করতে চান বিএনপির নেতাকর্মীরা। 
জানা গেছে, নিউইয়র্ক ছাড়াও নিউ জার্সি, পেনসিলভেনিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নিউ ইয়র্কে আনার প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ করে দলীয় নেতা-কর্মীদের আগ্রহের উপস্থিতি থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা নিজেদের অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কনস্যুলেট ও দূতাবাসের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা আয়োজনের আলোচনা থাকলেও আপাতত সেটা হচ্ছে না। মূলত ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার সাশ্রয়ের চিন্তায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে স্থানীয় বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, নাগরিক সংবর্ধনার বিষয়টি এখনও কনফার্ম হয়নি। কারণ, একটা অনুষ্ঠান করতে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ লাখ ডলার খরচ হয়। তাই প্রধানমন্ত্রী এত টাকা খরচ করে সংবর্ধনা নিতে চাচ্ছেন না। হয়তো দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে দেখা করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরটি স্মরণীয় করে তুলতে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। এদিকে সরকারি খরচে নিউ ইয়র্কে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন বাতিল হলেও স্থানীয় বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে বিকল্প নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজনের চেষ্টা করছে কয়েকটি গ্রুপ। মূলত দলভিত্তিক বিএনপির আভ্যন্তরীণ বিষয়ক সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন খোকনকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় তার সাথে নিউ ইয়র্ক বিএনপির সিনিয়র নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এজন্য বিভিন্ন গ্রুপ আলাদাভাবে আয়োজনের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে বিএনপি যুক্তরাষ্ট্র শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের সাবেক পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. মজিবুর রহমান মজুমদার, সিনিয়র নেতা জাকির এইচ চৌধুরী, এম আর বাশার, ডা. হাফিজ, নাছিম আহমদ, আলহাজ্ব সোলাইমান ভূঁইয়া, নিউইয়র্ক কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক নির্বাচিত এজিএস আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ারদের মতো আরো অনেক নেতার সাথে সমন্বয় না থাকায় এমনটা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তাদের সাথে সমন্বয় না থাকায় এমনটা হচ্ছে বলে জানা গেছে। আনোয়ার হোসেন খোকন তার বলয়ে থাকা জিল্লুর রহমান জিল্লু, আব্দুল লতিফ সম্রাট ও মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিলনসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে গ্রুপিং করার অভিযোগে অপর সিনিয়র কোনো নেতা তার সাথে কাজ করতে নারাজ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়তই তার বিরুদ্ধে লেখালেখি হচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফোরাম যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা মোতাহার হোসেন জানান, ‘আমরা অধীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষায় আছি আমাদের প্রিয় নেতা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীকে কিভাবে উষ্ণ সংবর্ধনা দেব। কিন্তু এখনো আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না পেয়ে অনেকটা অন্ধকারে রয়েছি। আমরা সিনিয়র নেতাদের সাথে পরামর্শ করে অবশ্যই প্রিয় নেতাকে বরণে সব চেষ্টা করবো।’ 
 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি