১৫ এপ্রিল ২০২৬

পারমাণবিক বোমা নয় ইরানের আসল শক্তি অন্যখানে

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১১ পিএম
পারমাণবিক বোমা নয় ইরানের আসল শক্তি অন্যখানে

ছাবেদ সাথী'র তাজা ভাবনা

ছাবেদ সাথী

ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি বিষয় নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিস্ময়কর সামরিক সাফল্যের দাবি করেছেন, যা পারস্য উপসাগরের ভূরাজনীতি আগামী প্রজন্মের জন্য বদলে দিতে পারে।

কিন্তু আরেকটি বিষয় নিয়েও সন্দেহ নেই এই যুদ্ধে আসলে কে জিতেছে। ইঙ্গিতটি স্পষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র নয়।

ইতিবাচক দিক হলো, ইরান হয়তো তার পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসতে পারে। তবে কারণটি ভিন্ন ট্রাম্প তাকে এর চেয়েও শক্তিশালী কিছু দিয়েছেন: পারস্য উপসাগর এবং বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির ওপর কার্যত প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা।

এই যুদ্ধে একটি বড় সামরিক শিক্ষা হলো কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র থাকা খুব একটা কার্যকর নয়। আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী যে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রতিহত হয়েছে।

এ ধরনের প্রতিরক্ষা ভেদ করতে হলে ‘ঝাঁক আক্রমণ’ প্রয়োজন অর্থাৎ একই লক্ষ্যবস্তুতে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র নিক্ষেপ করা, যাতে অন্তত কয়েকটি প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারে। এখানে সস্তা ড্রোন ব্যবহার করাই কার্যকর, কারণ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই কৌশল কার্যকর নয়। যদি নিশ্চিত না হওয়া যায় যে অস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাবে, তাহলে তা ব্যবহারের ঝুঁকি নেওয়া যায় না।

ইরান এখন বুঝেছে তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই কার্যকর, বরং আরও বেশি নমনীয়। এই সক্ষমতাই ট্রাম্পকে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবির অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে, কারণ ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা আঞ্চলিক পর্যায়ে পারস্পরিক ধ্বংসের পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম।

যদিও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু তারা ইরানকে উপসাগরের তেল-গ্যাস স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা বা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা থেকে থামাতে পারেনি।

সংক্ষেপে, ভূগোল, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র এই তিনটি উপাদানই ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতির বিনিময়ে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসতে পারে এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে।

বাস্তবে, এই নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইরান দাবি করে, প্রণালী বন্ধ নয় বরং জাহাজ চলাচলের জন্য তাদের অনুমতি নিতে হবে। যুদ্ধবিরতির পরও তারা এই নিয়ম কার্যকর রেখেছে এবং অনুমতি ছাড়া চলাচল করলে জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলতে পারে।

ইরান যুক্তি দিতে পারে তাদের লক্ষ্য সবসময়ই ছিল এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব কমানো। আর যুক্তরাষ্ট্র চলে গেলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নতুন সমঝোতার সুযোগ তৈরি হবে।

এক্ষেত্রে চীনও একটি বড় ভূমিকা নিতে পারে, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো চীনের ওপর আস্থা রাখতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে তেলের লেনদেন ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে হতে পারে যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধাক্কা হতে পারে।

অভ্যন্তরীণভাবে, ট্রাম্পের হুমকিমূলক কৌশল যেমন ইরান প্রণালী না খুললে কঠোর ধ্বংসযজ্ঞের হুমকি মার্কিন সামরিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে পৌঁছেছিল। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই গণহত্যামূলক নির্দেশ মেনে নেবে না এমন আশঙ্কাও তোলা হয়েছিল।

ট্রাম্পকে কেউ কেউ কৌশলী নেতা হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের মতে, তিনি যেন এক শিশুর মতো সেনাবাহিনীকে খেলনার মতো ব্যবহার করছেন যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ, সুনাম ও মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিও চাপে পড়েছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের আগে তেলের দাম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায় এই সবকিছুর বিনিময়ে কী অর্জিত হয়েছে? হাজারো হামলার পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা আগের চেয়ে কৌশলগতভাবে আরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

এখন ট্রাম্প তার ‘পরবর্তী লক্ষ্য’ নিয়ে কথা বলছেন কিন্তু সেটি কোথায়? গ্রিনল্যান্ড, কিউবা, নাকি মেক্সিকো?

১৪ এপ্রিল কংগ্রেস পুনরায় অধিবেশনে বসবে। তখন আইনপ্রণেতাদের সামনে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক নীতিকে থামানো, নাকি এর সব পরিণতির দায় নেওয়া। এর মাঝামাঝি কোনো পথ নেই।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি