২৬ জুলাই ২০২৬

পিট হেগসেথ: একজন বিপজ্জনক ও ব্যর্থ প্রতিরক্ষামন্ত্রী

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ পিএম
পিট হেগসেথ: একজন বিপজ্জনক ও ব্যর্থ প্রতিরক্ষামন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ

ছাবেদ সাথী

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পিট হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের সময় নিজের সাফল্যের মানদণ্ড নিজেই নির্ধারণ করেছিলেন। সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা, প্রাণঘাতী সক্ষমতা, মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, মানদণ্ড এবং প্রস্তুতি—এটাই আমার কাজ।’

কিন্তু দেড় বছর পর বাস্তবতা হলো, হেগসেথ তাঁর নিজের নির্ধারিত মানদণ্ডও পূরণ করতে পারেননি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করায় পেন্টাগনের বাজেট কার্যত সংকটে পড়েছে। সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্য, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বেসামরিক কর্মচারীদের মনোবলও তলানিতে। সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের উদ্বেগ বাড়লেও হেগসেথের প্রতিক্রিয়া ছিল বিভ্রান্তিকর ও ব্যয়বহুল একটি পরিকল্পনা, যাতে সেনাসদস্যদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরীক্ষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেগসেথের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় তিনি যেন একজন ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার, কার্যকর প্রতিরক্ষামন্ত্রী নন। প্রশাসনের এক সাম্প্রতিক পোস্টে তাঁর বেঞ্চ প্রেসের প্রশংসা করা হলেও বাস্তবে তাঁর নেতৃত্বে পেন্টাগনের অবস্থা বিশৃঙ্খল। এভাবে চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিপক্ষ তাঁর অযোগ্যতার সুযোগ নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

হয়তো সেই অপেক্ষাও খুব বেশি দীর্ঘ নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হেগসেথের দুর্বল কৌশলগত পরিকল্পনার সুযোগ নিয়ে ইরানের বাহিনী একাধিক হামলা চালিয়েছে, যাতে এখন পর্যন্ত ১৭ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অনেক মৃত্যুই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। মার্চ মাসে কুয়েতে ছয় সেনাসদস্য নিহত হন, যদিও সামরিক কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে তাঁদের অস্থায়ী কর্মস্থল হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্প ও হেগসেথের অহংকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত সেই সতর্কতাকে গুরুত্ব দেয়নি। এখন ছয়টি পরিবারকে সেই অপূরণীয় ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

মার্চ মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বলেছিলেন, ‘এটি ইরাক নয়। এটি অন্তহীন যুদ্ধও নয়।’ ওই মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল ইরান যুদ্ধে বিজয়ের সংজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে সমালোচনার জবাব দেওয়া। কিন্তু সোমবারের সর্বশেষ পেন্টাগন ব্রিফিংয়ে তিনজন মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং গত দুই সপ্তাহে শতাধিক সেনা আহত হওয়ার পর যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যান কর্মকর্তারা। তখন হেগসেথ আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি।

কেউই হেগসেথের কাছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে অনুমান করার প্রত্যাশা করেন না। সমস্যা হলো, তিনি নিজেই যেন বিশ্বাস করেন যে তিনি তা পারেন—ঠিক একজন টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপকের মতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে, যাঁর ভুল পূর্বাভাসের জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। কিন্তু হেগসেথ আর টেলিভিশনের স্টুডিওতে নেই। তাঁর সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রভাব পড়ছে মার্কিন সেনাসদস্য, তাঁদের পরিবার এবং দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর।

এই যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান মূল্য সম্পর্কে হেগসেথের উচিত ছিল জনগণকে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি সামাজিক মাধ্যমে নিজের বেঞ্চ প্রেসের কৃতিত্ব নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

হেগসেথের এমন মনোভাব—যেন তাঁর ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি অন্য কেউ সামলে নেবে—পেন্টাগনকে নৈতিক ও আর্থিক উভয় সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি পেন্টাগন কংগ্রেসের কাছে সৈন্যদের প্রশিক্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে স্থানান্তরের অনুমতি চেয়েছে। হেগসেথ এর জন্য “অপ্রত্যাশিত সামরিক প্রয়োজন”-কে দায়ী করলেও, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের বহু আইনপ্রণেতাই আগেই সতর্ক করেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পেন্টাগনের বাজেটে বড় চাপ সৃষ্টি করবে। বিস্মিত হয়েছেন যেন একমাত্র হেগসেথই।

পেন্টাগনের আর্থিক সংকট শুধু যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রতিটি সেনাসদস্য ও বেসামরিক কর্মচারীর দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে। দুর্বল বাজেট পরিকল্পনার কারণে পেন্টাগন পরিচালিত শিশু পরিচর্যা কর্মসূচিতে নিবন্ধিত ১ লাখ ৭২ হাজার সামরিক পরিবারের শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ১৯ হাজার কর্মী নিয়োগে সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সক্রিয় ও অবসরপ্রাপ্ত লাখো সেনাসদস্যকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সামরিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা আধুনিকায়নের প্রস্তাবও বাজেট সংকটের কারণে থমকে গেছে।

হেগসেথ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে পেন্টাগনের ভিত্তি হবে ‘যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা, প্রাণঘাতী সক্ষমতা, মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, মানদণ্ড ও প্রস্তুতি।’ কিন্তু বাস্তবে তিনি এমন একটি প্রতিরক্ষা বিভাগ গড়ে তুলেছেন, যা তাঁর ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটিও কার্যকরভাবে অর্জন করতে পারেনি। পেন্টাগন অস্ত্র, অর্থ এবং মানবজীবন ব্যয় করেও এমন একটি সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে, যা ইরান যুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতেই হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে সেনাসদস্য ও প্রবীণ ভেটেরানদের জন্য সেবার মানও নজিরবিহীনভাবে অবনতির দিকে গেছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে হেগসেথ হয়তো নিজের সময় উপভোগ করছেন। কিন্তু তাঁর দায়িত্বকাল মার্কিন সেনাসদস্যদের, তাঁদের পরিবারের এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ড লজ্জাজনক এবং এমন পর্যায়ের যে, অনেক রিপাবলিকানও ব্যক্তিগত আলোচনায় তা স্বীকার করেন।

দেশের স্বার্থে এখনই তাঁর পদত্যাগ করা উচিত, যাতে পেন্টাগনকে আরও অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির মুখে না পড়তে হয়।

সবশেষে বলা যায়, যদি ফিটনেস প্রদর্শনই তাঁর প্রকৃত আগ্রহ হয়, তাহলে হয়তো টিকটকের ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবেই তাঁর ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হতে পারে।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি, কানেকটিকাট


সঙ্গীত একাডেমি, কানেকটিকাট

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি