সারাটোগা থেকে সারাতভ: স্বাধীনতার প্রতিটি যুদ্ধেই দরকার এক শক্তিশালী মিত্র
ছাবেদ সাথী'র তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে আঙ্কারায় জোট নেতাদের সাম্প্রতিক সম্মেলনকে “ঐতিহাসিক” বলে অভিহিত করেছিলেন। আজকাল প্রায় প্রতিটি বড় আন্তর্জাতিক ঘটনাকেই এ বিশেষণ দেওয়া হয়। এটি ঘটনার গুরুত্বের চেয়ে মানুষের মনস্তত্ত্ব—ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষাকেই বেশি প্রতিফলিত করে।
কিন্তু গত সপ্তাহের প্রকৃত ইতিহাস রচিত হয়েছে আঙ্কারা থেকে এক হাজার মাইলেরও বেশি উত্তর-পূর্বে, রাশিয়ার একটি শহরে—সারাতভে। এমন একটি শহর, যার নাম অধিকাংশ আমেরিকান তো বটেই, অনেক ইউরোপীয়ও শোনেননি।
৮ জুলাই ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় সারাতভের তেল শোধনাগারের প্রধান পরিশোধন ইউনিট ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে পুরো স্থাপনাটি বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এর কয়েক দিন আগেই ইউক্রেন একই ধরনের হামলা চালিয়ে রাশিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগার ওমস্ক-কেও অচল করে দেয়। একই রাতে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর নয়টি তেলবাহী জাহাজ, ক্রিমিয়ার ঝানকয় বিমানঘাঁটি এবং কের্চের পোর্ট ক্রিম-এও হামলা চালানো হয়।
আঙ্কারায় ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পাশে বসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার একটি শব্দ উচ্চারণ করছিলেন—'সমঝোতা' । একজন আলোচনানির্ভর রাজনীতিকের কাছে শব্দটি স্বাভাবিক। সংবাদমাধ্যম আঙ্কারার বৈঠকের দৃশ্য ও বার্তা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে, বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের প্রতিটি বক্তব্যের ব্যাখ্যা করবেন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চার দিন আগে দেওয়া ট্রাম্পের ভাষণের দিকে।
তিনি বলেছিলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা এমন একটি জাতি, যার মূলমন্ত্র ছিল—‘বিজয় অথবা মৃত্যু’ এবং ‘স্বাধীনভাবে বাঁচো, না হলে মরো’। আমরা স্বৈরশাসকদের পরাজিত করেছি, অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করেছি এবং বারবার স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছি।’
এই কথাগুলো যেন আজকের ইউক্রেনেরই প্রতিচ্ছবি। একটি জাতি, যারা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে; এমন এক জনগণ, যারা মস্কোতে বসা এক দমন-পীড়নকারী শাসকের অধীনে থাকতে রাজি নয় এবং স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত। ইউক্রেন যেন আমেরিকার স্বাধীনতার ইতিহাসেরই একটি প্রতিফলন—তবুও যুক্তরাষ্ট্র যেন সেই আয়নার দিকে তাকাতে অনিচ্ছুক।
ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা ধরা যাক। ১৭৭৭ সালের অক্টোবরে সারাটোগার যুদ্ধে ব্রিটিশ জেনারেল জন বার্গয়েন তার পুরো বাহিনীসহ আত্মসমর্পণ করেন। এই বিজয়ই ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুইকে বিশ্বাস করায় যে আমেরিকান উপনিবেশগুলো সত্যিই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে।
আমেরিকান ইতিহাসবিদ এডমন্ড মরগান লিখেছিলেন, ‘সারাটোগা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। কারণ এই বিজয়ের ফলেই আমেরিকানরা সেই বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছিল, যা ছিল বিজয়ের শেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।’
তৎকালীন ফ্রান্সের অর্থনীতি ছিল ১৩টি আমেরিকান উপনিবেশের সম্মিলিত অর্থনীতির তুলনায় ছয় থেকে সাত গুণ বড়। স্বাধীনতাকামীদের ব্যবহৃত অধিকাংশ গানপাউডার সরবরাহ করেছিল ফ্রান্স, সৈন্য পাঠিয়েছিল এবং ইয়র্কটাউনে ব্রিটিশ বাহিনীকে অবরুদ্ধ করতে নৌবহর মোতায়েন করেছিল।
এখন কল্পনা করুন—সারাটোগার বিজয়ের পর ফ্রান্স যদি নৌবহর না পাঠিয়ে শুধু একজন দূত পাঠাত। যদি ভার্সাই আমেরিকানদের ব্রিটিশ মুকুটের সঙ্গে সমঝোতার পরামর্শ দিত এবং ১৩টি উপনিবেশ ও লন্ডনের মধ্যে আপসের পথ খুঁজতে বলত?
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও পরবর্তী সাত বছর সেই স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমেই ছিল। প্রকৃত স্বাধীনতা আসে তখনই, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিদ্রোহ দমন করার আশা ছেড়ে দেয়। আর তারা তা করেছিল, কারণ আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র ফ্রান্স যুদ্ধকে ব্রিটেনের জন্য জয়-অযোগ্য করে তুলেছিল।
যেমন ১৭৭৭ সালের অক্টোবরে ইতিহাস লেখা হয়েছিল সারাটোগায়, তেমনি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইতিহাস লেখা হচ্ছে সারাতভে।
আমেরিকানরা যেমন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকতে চায়নি, তেমনি ইউক্রেনও মস্কোর আধিপত্যে ফিরে যেতে চায় না। আর এই যুদ্ধের আগ্রাসী সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ জ্বালানি সংকট ও পেট্রোল পাম্পে লম্বা সারি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
অবশ্যই, প্রতিটি ঐতিহাসিক তুলনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এ তুলনা ইউক্রেনের পক্ষেই বেশি প্রযোজ্য। আমেরিকার উপনিবেশবাসীরা মূলত ইংরেজ বংশোদ্ভূত ছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন জন্মেছিলেন ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন এবং সারাজীবন ইংরেজিতেই কথা বলেছেন।
অন্যদিকে ইউক্রেন একটি স্বতন্ত্র জাতি, যার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত রয়েছে। রাশিয়াও বহু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সেই সীমান্তকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ব্রিটেন তার উপনিবেশ ধরে রাখতে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু রাশিয়া যুদ্ধ করছে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ও একটি জাতিকে মানচিত্র থেকেই মুছে ফেলার লক্ষ্যে। রুশ নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই এমন বক্তব্য দিয়েছে, যা অনেকের মতে জাতিগত নির্মূলের ইঙ্গিত বহন করে।
ইউক্রেনের প্রজাতান্ত্রিক ঐতিহ্যও অনেক পুরোনো। ১৭১০ সালে পিলিপ অরলিকের সংবিধান, যেখানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও সামাজিক চুক্তির ধারণা ছিল, তা ফিলাডেলফিয়ার মার্কিন সংবিধানেরও ৭৭ বছর আগে রচিত।
তবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্স আমেরিকার স্বাধীনতার জন্য সৈন্য পাঠিয়েছিল, নৌবহর পাঠিয়েছিল এবং নিজেদের রক্তও ঝরিয়েছিল। ইউক্রেন এমন কোনো আত্মত্যাগ চায় না। তারা শুধু চায়—বিশ্ব স্বীকার করুক যে তাদের লড়াই ন্যায়সঙ্গত এবং আগ্রাসী শক্তির পরাজয়ই ন্যায়বিচারের দাবি। তারা চায় আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা, রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ ইউক্রেনের হাতে তুলে দেওয়া, অব্যাহত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন এবং যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র।
আঙ্কারা বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ছিল—ট্রাম্প ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিদিন রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে থাকা ইউক্রেনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ট্রাম্প এটিকে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করেন। সেটি সত্য। তবে যে দেশ আগ্রাসনের শিকার, তার জন্য প্রতিটি অস্ত্রই আত্মরক্ষার অস্ত্র।
রাশিয়ার ইস্কান্দার ও কিঞ্জাল ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানায় আঘাত হানাও আত্মরক্ষারই একটি কার্যকর উপায়। আকাশে উড়ন্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার চেয়ে উৎপাদন পর্যায়েই তা ধ্বংস করা অনেক বেশি কার্যকর এবং এতে অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
জনমত জরিপের পর জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থানকে সমর্থন করেন না; তারা ইউক্রেনের প্রতি সহানুভূতিশীল।
১১টি সময় অঞ্চলে বিস্তৃত বিশাল এক আগ্রাসী শক্তি ছোট প্রতিবেশীকে গ্রাস করতে চাইছে—কারণ তারা বিশ্বাস করে, তারা তা করতে পারবে। এই যুদ্ধে ইউক্রেন যেন ডেভিড, আর রাশিয়া গোলিয়াথ। ইউক্রেন নিজের শক্তি খুঁজে পেয়েছে। অথচ যে আমেরিকা একসময় নরম ভাষায় কথা বলে বড় শক্তি প্রদর্শনের কৌশল জানত, সেই আমেরিকাই আজ যেন সেই দৃঢ়তা ফিরে পেতে সংগ্রাম করছে।
৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কিয়েভে মাদার ইউক্রেন ভাস্কর্যকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার লাল-সাদা-নীল রঙে আলোকিত করা হয়। ইউক্রেন আজও আমেরিকার স্বাধীনতার ইতিহাসকে সম্মান করে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমেরিকানরা কি এখনও নিজেদের সেই ইতিহাসকে একইভাবে স্মরণ করে?
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
১০২তম জন্মবার্ষিকী : জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের নাম যাদু মিয়া
সঙ্গীত একাডেমি