শুধু আমেরিকার জাতীয় স্বার্থেই অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়া উচিত
ছাবেদ সাথী'র কলাম আমেরিকার ভেতরে বাইরে
ছাবেদ সাথী
প্রায় চার দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বিতর্ক চলছে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বৈধ মর্যাদা (লিগ্যালাইজেশন) দেওয়া উচিত কি না। কিন্তু এই বিতর্ক আজও কোনো কার্যকর সমাধানে পৌঁছায়নি, কারণ প্রশ্নটাই ভুলভাবে করা হচ্ছে। কংগ্রেসের উচিত হবে এই প্রশ্ন তোলা যে, কীভাবে এমন একটি বৈধতা কর্মসূচি তৈরি করা যায়, যা কেবল সেইসব অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য প্রযোজ্য হবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রয়োজন পূরণ করছেন।
জাতীয় স্বার্থভিত্তিক একটি বৈধতা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অভিবাসীদের আইনগত মর্যাদা দেওয়া যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের স্থায়ী বাসিন্দার (গ্রিন কার্ডধারী) মর্যাদা বা নাগরিকত্বের পথও দিতে হবে। তাঁদের শুধু এমন একটি বৈধ অবস্থান প্রয়োজন, যা তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেবে।
সর্বশেষ বড় ধরনের বৈধতা কর্মসূচি চালু হয়েছিল ১৯৮৬ সালের ইমিগ্রেশন রিফর্ম অ্যান্ড কন্ট্রোল অ্যাক্ট (IRCA)-এর মাধ্যমে। এর উদ্দেশ্য ছিল, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এবং আইনের নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা পূরণকারী অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়া। বিনিময়ে এমন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ছিল, যাতে ভবিষ্যতে নতুন অনথিভুক্ত অভিবাসীরা এসে তাঁদের স্থান নিতে না পারেন।
ওই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৭ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসী বৈধ মর্যাদা পান। কিন্তু প্রতিশ্রুত আইন প্রয়োগমূলক ব্যবস্থাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ১৯৯৭ সালের শুরুতেই বৈধতা পাওয়া ওই ২৭ লাখ মানুষের জায়গা নতুন অনথিভুক্ত অভিবাসীরা পূরণ করে ফেলেন।
অভিবাসন বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ এই ব্যর্থতার পর রিপাবলিকানদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “প্রথমে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, নইলে তা আর কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।” তবে এর অর্থ এই নয় যে বৈধতা কর্মসূচি বিলম্বিত করতে হবে। বরং এমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর (self-executing) আইনগত বিধান গ্রহণ করা যেতে পারে, যা আলাদা প্রশাসনিক বাস্তবায়নের অপেক্ষা করবে না।
একটি জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বৈধতা কর্মসূচির প্রথম শর্ত হওয়া উচিত—যোগ্যতা নির্ধারণে দেশের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ১৯৮৬ সালের আইনের অধীনে আবেদনকারীদের শুধু পাঁচ বছরের বসবাসই নয়, ওই সময়ে তাঁদের অনথিভুক্ত অবস্থায় থাকার বিষয়টিও প্রমাণ করতে হতো। পাশাপাশি অন্য সব দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে হতো।
২০২৫ সালের ডিগনিটি অ্যাক্ট আরও সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ। সেখানে বলা হয়েছে, আবেদনকারীকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২০-এর আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শারীরিকভাবে অবস্থান করার প্রমাণ দিতে হবে এবং ৭,০০০ ডলার পুনঃপ্রতিদান (restitution) হিসেবে পরিশোধ করতে হবে।
কংগ্রেসের উচিত বৈধতার যোগ্যতা নির্ধারণ করা এই ভিত্তিতে যে, নির্দিষ্ট কোনো অনথিভুক্ত অভিবাসীকে বৈধভাবে বসবাস ও কাজের সুযোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্র কী লাভ করবে। এতে বৈধতা কোনো দয়া বা উপহার হবে না; বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি কার্যকর নীতি হয়ে উঠবে।
গত চার দশকে প্রত্যাখ্যাত বিভিন্ন বৈধতা বিলের সমর্থকেরা দাবি করে আসছেন, যেসব অনথিভুক্ত অভিবাসীকে তাঁরা বৈধতা দিতে চান, তাঁরা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। উদাহরণ হিসেবে আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিল বলেছে, “অনথিভুক্ত অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অপরিহার্য অবদানকারী। ২০২৩ সালে তাঁদের পরিবারগুলো ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারকে মোট ৮৯.৮ বিলিয়ন ডলার কর দিয়েছে এবং তাঁদের মোট ব্যয়ক্ষমতা ছিল ২৯৯ বিলিয়ন ডলার।”
এই অর্থনৈতিক অবদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা দেশের প্রতিটি অনথিভুক্ত অভিবাসীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। তাই বৈধতা সীমিত রাখা উচিত তাঁদের জন্য, যারা সত্যিই অর্থনীতিতে অপরিহার্য অবদান রাখছেন অথবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রয়োজন পূরণ করছেন। যেমন—সামরিক বাহিনীতে সেবা প্রদানকারী, চিকিৎসাসেবাবঞ্চিত এলাকায় কর্মরত চিকিৎসক ও নার্স, শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অথবা অপরাধীদের পুনর্বাসনে সহায়তাকারী ব্যক্তিরা।
১৯৮৬ সালের আইনে বৈধতা কার্যকর করা হলেও আইন প্রয়োগের অংশ—বিশেষ করে নিয়োগদাতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা—শুধু আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল। কংগ্রেস কখনো এমন কোনো যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি, যার মাধ্যমে নিয়োগদাতারা সহজেই নিশ্চিত হতে পারবেন যে কোনো অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার বৈধ অনুমতি রয়েছে কি না। অথচ কার্যকর নিয়োগদাতা-নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনো কর্মসংস্থানের অনুমোদন ইলেকট্রনিকভাবে যাচাই করার আইন নিয়ে কংগ্রেসে আলোচনা চলছে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর আইনগত বিধান এই বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে—প্রয়োজনীয় ভিসা ছাড়া অভিবাসী পরিবহনের জন্য পরিবহন সংস্থাগুলোর জরিমানা বৃদ্ধি, মানবপাচার ও অভিবাসন-সংক্রান্ত অন্যান্য অপরাধের শাস্তি কঠোর করা, এবং মানবপাচারবিরোধী আইনের এমন কিছু বিধান সংশোধন করা, যা বর্তমানে অনেক অভিভাবককে পেশাদার চোরাকারবারিদের মাধ্যমে সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে উৎসাহিত করছে। এতে শিশুরা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এটিও মনে রাখা জরুরি যে, বৈধতা কোনো "সব অথবা কিছুই নয়" ধরনের সিদ্ধান্ত হতে হবে—এমন নয়।
লাখো অভিবাসী আইনসম্মতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। তাঁরা বছরের পর বছর ভিসার অপেক্ষা করেছেন, আবেদন ফি পরিশোধ করেছেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন এবং সরাসরি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ফেডারেশন ফর আমেরিকান ইমিগ্রেশন রিফর্ম (FAIR)-এর ভাষায়, “অবৈধ অভিবাসন নিয়ম মেনে চলা মানুষের প্রতি উপহাসস্বরূপ। এটি অন্যায্যভাবে ‘লাইন কেটে’ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় এবং সরকারের সম্পদ আইনসম্মত আবেদনকারীদের পরিবর্তে অবৈধ অভিবাসীদের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য করে।”
জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বৈধতা দেওয়ার নীতি এই পার্থক্যকে স্বীকার করে সীমিত সুবিধা দিতে পারে। অর্থাৎ, বৈধতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার অধিকার দেবে এবং নির্বাসনের ভয় দূর করবে; কিন্তু নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা সৃষ্টি করবে না।
জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বৈধতা কর্মসূচি এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিধান—এ দুটির সমন্বয় হয়তো আদর্শ সমাধান নয়। তবে অভিবাসন সংস্কারের অন্য যেকোনো প্রস্তাবের তুলনায় এটি আইন হিসেবে পাস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। অন্যথায়, গত ৪০ বছর ধরে চলা একই নিষ্ফল বিতর্কই কেবল চলতে থাকবে।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সারাটোগা থেকে সারাতভ: স্বাধীনতার প্রতিটি যুদ্ধেই দরকার এক শক্তিশালী মিত্র
১০২তম জন্মবার্ষিকী : জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের নাম যাদু মিয়া
সঙ্গীত একাডেমি