ট্রাম্পের নতুন গ্রিন কার্ড নীতি বৈধ অভিবাসনের ওপর আঘাত
ছাবেদ সাথী'র তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
গত মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসন যে নতুন নীতি ঘোষণা করেছে, তার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত যেসব ব্যক্তি গ্রিন কার্ড পেতে চান, তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে আবেদন করতে হবে।
অর্থাৎ, স্থায়ী বাসিন্দা (পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট) হওয়ার জন্য আগ্রহী অ-নাগরিকদের এখন বিদেশে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শুধুমাত্র “অসাধারণ পরিস্থিতিতে” গ্রিন কার্ড প্রদান করা হবে।
মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংস্থার (ইউএসসিআইএস) একজন মুখপাত্র বলেছেন, “এই নীতি আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থাকে আইনের মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী পরিচালিত হতে সহায়তা করবে, ফাঁকফোকর ব্যবহারে উৎসাহিত করবে না।”
কিন্তু বাস্তবে এই পদক্ষেপ বৈধ অভিবাসনের ওপর এক অযৌক্তিক আঘাত, যা আইন মেনে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে চাওয়া লাখো মানুষের জীবনকে ওলটপালট করে দিতে পারে। এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা থেকে বিচ্যুতি এবং আইনগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন অস্থায়ী কর্মভিসা, শিক্ষার্থী বা পর্যটক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্যক্তিরা, পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরাও। কেউ চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার কারণে, আবার কেউ মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করার কারণে গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করেন। ২০২৪ সালে প্রায় ১৪ লাখ গ্রিন কার্ড প্রদান করা হয়, যার বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, গত এক দশকে প্রদত্ত অধিকাংশ গ্রিন কার্ডই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে।
জনসমালোচনার মুখে পড়ে প্রশাসন নতুন নিয়মের প্রভাবকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ নিয়ে তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আরও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।
নতুন নিয়ম আবেদনকারীদের জন্য এক ভয়াবহ প্রশাসনিক সংকট তৈরি করতে পারে। অনেককে স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে এবং এরপর গ্রিন কার্ড অনুমোদনের জন্য মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে—তাও আবার যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় প্রবেশের কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই। এর ফলে কেউ চাকরির সুযোগ হারাতে পারেন, আবার কারও পরিবার দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে গ্রিন কার্ড আবেদনের জটও আরও বাড়বে। ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে এই নীতিকে “আরও ন্যায্য ও কার্যকর” বলে দাবি করছে, বাস্তবে এটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
এছাড়া এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক কারণে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে পারবেন না। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া ও ইরানের নাগরিকদের জন্য নিজ দেশে আবেদন করা সম্ভব নয়, কারণ সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কনস্যুলার অফিস নেই। হাইতি ও ইউক্রেনের নাগরিকদের জন্য নিজ দেশে ফেরা নিরাপদ নয়। আবার যেসব দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা ভিসা স্থগিতাদেশের আওতায় রয়েছে, সেসব দেশের নাগরিকরা ফিরে গেলে সেখানেই আটকা পড়তে পারেন।
ইউএসসিআইএস দাবি করছে, তারা কেবল ‘আইনের মূল উদ্দেশ্যে ফিরে যাচ্ছে, যাতে বিদেশিরা যথাযথভাবে অভিবাসন ব্যবস্থা অনুসরণ করে।’ কিন্তু এই দাবি সঠিক নয়। কয়েক দশক ধরে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় প্রশাসনের আমলেই মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করে আসছেন।
১৯৫২ সালে কংগ্রেস যে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট পাস করে, তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, দেশ ছাড়াই মানুষ গ্রিন কার্ড পেতে পারে। কোথাও বলা হয়নি যে এই সুবিধা কেবল “অসাধারণ পরিস্থিতির” জন্য প্রযোজ্য।
বিদ্যমান আইনের নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করছে, যা তাদের নেই। নতুন এই নীতি কার্যত অভিবাসন আইন পরিবর্তনের শামিল, অথচ সংবিধান অনুযায়ী আইন পরিবর্তনের ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। এ কারণেই নীতিটি ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে, আর সেই সময়ে হাজার হাজার আবেদনকারী ও তাদের পরিবার অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে থাকবে।
নতুন গ্রিন কার্ড নীতি উদ্বেগজনক, কারণ এটি বৈধ অভিবাসনের ওপর চলমান বৃহত্তর আক্রমণেরই অংশ। প্রশাসন আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) প্রদানের সুযোগ সীমিত করেছে, অস্থায়ী বহিষ্কার-সুরক্ষা কর্মসূচি বাতিল করেছে, শরণার্থী গ্রহণ বন্ধ করেছে, কর্মভিসা ও শিক্ষার্থী ভিসার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং গ্রিন কার্ড অনুমোদনের হার কমিয়ে দিয়েছে। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অবৈধ অভিবাসনের তুলনায় বৈধ অভিবাসন কমানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের পদক্ষেপ আড়াই গুণ বেশি প্রভাব ফেলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব পদক্ষেপ কীভাবে দেশকে আরও নিরাপদ করছে?
অবশ্যই, প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড দেওয়া নিয়ে কিছু মানুষের উদ্বেগ থাকতে পারে। কিন্তু এ ধরনের বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কংগ্রেসের, এককভাবে প্রেসিডেন্টের নয়। অভিবাসন নীতিতে প্রেসিডেন্টের বিস্তৃত ক্ষমতা থাকলেও, তিনি একতরফাভাবে এমন কোনো স্মারক জারি করতে পারেন না, যা বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয়।
এই নতুন নীতির পক্ষে কোনো যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। এটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশ্বসেরা মেধাবীদের যুক্তরাষ্ট্রে আকৃষ্ট করা আরও কঠিন করে তুলবে। একই সঙ্গে অনেক যোগ্য ব্যক্তিকে গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করা থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। অথচ গত বছর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন বৈধ অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখে।
নতুন গ্রিন কার্ড নীতি ক্ষতিকর, অযৌক্তিক এবং আইনগতভাবে সমস্যাসঙ্কুল। প্রশাসনের উচিত বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করা, শাস্তিমূলক নতুন বাধা সৃষ্টি করা নয়।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি