যুক্তরাষ্ট্রে নীতির কঠোরতায় অভিবাসনে ‘ঐতিহাসিক পতন’
ছাবেদ সাথী'র কলাম: তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
আরেকটি স্বাধীনতা দিবস প্যারেড, পতাকা ও যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রা নিয়ে বক্তৃতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো যে শক্তি এই দেশকে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে, অর্থাৎ উন্নত জীবনের আশায় মানুষের এই দেশে আগমন, সেই শক্তির প্রতি কি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা রয়েছে?
এই গল্প শুধু আমেরিকার অতীতের নয়; এটি দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা যেমন গ্রিন কার্ডের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া, বিভিন্ন দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অনুমোদন হ্রাসসহ নানা পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক নিট অভিবাসন ২৭ লাখে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৩ লাখে, আর ২০২৬ সালে তা নেমে আসতে পারে মাত্র ৩ লাখ ২১ হাজারে। ব্যুরো একে ‘ঐতিহাসিক পতন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অভিবাসনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পেছনে বিভিন্ন যুক্তি রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় যুক্তিগুলোর একটি হলো অভিবাসীরা অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারের বাজেটের ওপর নেতিবাচক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন।
এই উদ্বেগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জনসংখ্যা বাড়লে সরকারি সেবার চাহিদাও বাড়ে। কিন্তু আমার সহ-লেখকত্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখায়, অভিবাসীরা কেবল অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতির ওপর বোঝা এই ধারণার সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল নেই।
২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, কোনো অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা অভিবাসনের কারণে ১ শতাংশ বাড়লে, সেই অঙ্গরাজ্যের বেসরকারি খাতের মোট দেশজ উৎপাদন (প্রাইভেট সেক্টর জিডিপি) গড়ে ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আয়ের প্রবৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকেও ছাড়িয়ে যায়।
তবে এই প্রভাব সব অঙ্গরাজ্যে সমান নয়। আমাদের সিমুলেশন অনুযায়ী, কোনো অঙ্গরাজ্যের মোট জনসংখ্যা যদি সম্পূর্ণভাবে অভিবাসনের মাধ্যমে ১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে বেসরকারি খাতের জিডিপি ০.৫৭ শতাংশ থেকে ৪.৪১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব অঙ্গরাজ্যে অভিবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক কম—যেমন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া (২.৯৭%), মন্টানা (৪.০৪%), মিসিসিপি (৪.০২%), নর্থ ডাকোটা (২.৪৮%) এবং ওয়াইওমিং (২.৮৯%) সেখানে অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি দেখা যায়। একইভাবে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মাত্রা বেশি এমন অঙ্গরাজ্য—যেমন নিউ হ্যাম্পশায়ার (৩.৮১%), সাউথ ডাকোটা (৩.১৪%), আইডাহো (২.৭০%) এবং টেনেসি (৩.২৭%) অভিবাসনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
সাম্প্রতিক জনসংখ্যাগত প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরও কমে যাবে। আগামী ১০ বছরে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হবে ০.৩ শতাংশ, আর ২০৩৭ থেকে ২০৫৬ সালের মধ্যে তা নেমে আসবে মাত্র ০.১ শতাংশে।
একই সঙ্গে জন্মহার কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে অভিবাসনের গুরুত্ব আরও বাড়বে। সিবিওর হিসাব বলছে, অভিবাসন না থাকলে ২০৩০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে।
বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দ্রুত বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সিবিওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের তুলনায় ২৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের অনুপাত যেখানে ২.৭, আগামী তিন দশকে তা কমে দাঁড়াবে ২.২-এ। এর অর্থ হলো—কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাবে, নতুন উদ্ভাবন কম হবে, সামাজিক নিরাপত্তা (সোশ্যাল সিকিউরিটি) ও অন্যান্য কর্মসূচিতে অবদান কমবে এবং প্রবীণদের সেবা দেওয়ার জন্যও মানুষের ঘাটতি তৈরি হবে।
এই বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপরও। যদিও অভিবাসন আইন প্রণয়ন ফেডারেল সরকারের এখতিয়ার, তবুও জাতীয় পর্যায়ের আইনপ্রণেতারা নিজেদের অঙ্গরাজ্যের স্বার্থে অভিবাসন আইন সংস্কার করতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অঙ্গরাজ্য এবং তুলনামূলক ছোট সরকার ও কম নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির (যেগুলো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত বা ‘রেড স্টেট’ হিসেবে পরিচিত) অঙ্গরাজ্যগুলো অভিবাসন সংস্কার থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারে।
এখানেই বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ। যেসব অঙ্গরাজ্য অভিবাসন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন, তারাই আবার জনসংখ্যা হ্রাস ও শ্রমিক সংকট নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। বাস্তবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অভিবাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রয়োজন তাদেরই।
এছাড়া অঙ্গরাজ্যগুলো চাইলে এমন নীতিও গ্রহণ করতে পারে, যাতে তারা অভিবাসন থেকে আরও বেশি সুবিধা পায়। করের বোঝা কমানো, সরকারের আকার সীমিত রাখা এবং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার মাধ্যমে অভিবাসনের ইতিবাচক প্রভাব বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে নতুন আগতদের দ্রুত কাজের সুযোগ, ব্যবসা শুরু, বিদেশি শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং পেশাগত লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ করলে তারা দ্রুত অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে অভিবাসীদের দেশ, স্বাধীনতা ও আশার প্রতীক হিসেবে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে। নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে খোদাই করা “দ্য নিউ কলোসাস” কবিতায় বলা হয়েছে, “তোমার ক্লান্ত, দরিদ্র, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় থাকা জনতাকে আমার কাছে পাঠাও।” একইভাবে গ্যালাপের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, রেকর্ড ৭৯ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ইতিবাচক বিষয়।
যারা মনে করেন, অভিবাসীরা দেশের সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন এবং অর্থনীতিতে যতটা অবদান রাখেন তার চেয়ে বেশি সুবিধা গ্রহণ করেন, তাদের জন্য আমাদের গবেষণার ফল কিছুটা আশ্বস্ত করার মতো। কারণ অভিবাসন শুধু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে ‘আমেরিকান ড্রিম’ অর্জনের সুযোগই দেয় না; সেই সাহসী উদ্যোগ থেকে আমেরিকানরাও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন।
বিশেষ করে যেসব অঙ্গরাজ্য এখনও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সংগ্রাম করছে, তাদের জন্য নতুন অভিবাসীরা কোনো অতিরিক্ত ব্যয় বা বোঝা নয়। বরং তারাই হতে পারেন আগামী দিনের অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান শক্তি।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সারাটোগা থেকে সারাতভ: স্বাধীনতার প্রতিটি যুদ্ধেই দরকার এক শক্তিশালী মিত্র
সঙ্গীত একাডেমি, কানেকটিকাট
সঙ্গীত একাডেমি