এখন কি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্কার সম্ভব?
অভিবাসন সংস্কার
ছাবেদ সাথী
যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ বড় ধরনের অভিবাসন সংস্কার আইন পাস হয়েছিল ১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান–এর সময়ে, প্রায় ৪০ বছর আগে। ডেমোক্র্যাটরা বহু বছর ধরেই একটি সামগ্রিক অভিবাসন সংস্কারের পক্ষে চাপ দিয়ে আসছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের ধারাবাহিক জবাব ছিল আগে সীমান্ত বন্ধ করতে হবে।
এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটাই করেছেন। তাহলে প্রশ্ন হলো এখন কি ব্যাপক অভিবাসন আইন প্রণয়ন সম্ভব?
এটি করা জরুরি। মিনেসোটা ও দেশের অন্যান্য অংশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো একটি অকার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থার ফল যাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন–এর উন্মুক্ত সীমান্ত নীতি ভাঙনের কিনারায়, এমনকি তারও ওপারে ঠেলে দিয়েছিল। অভিবাসন সংস্কার সহজ হবে না বিশেষ করে যখন কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই ব্যবস্থাকে ভাঙা অবস্থায় রাখতেই লাভ দেখছে।
তবে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান কংগ্রেসের অধীনে এই সংস্কার বাস্তবায়নই সবচেয়ে কার্যকর উপায় যাতে অভিবাসন সংস্কার কল্যাণ সুবিধা বা সহজ নাগরিকত্বের জন্য একটি 'খালি চেক' হয়ে না দাঁড়ায়। এ জন্য কয়েকটি অপরিহার্য উপাদান দরকার।
প্রথমত, অভিবাসন সংস্কার হতে হবে দ্বিদলীয়। বিষয়টি এতটাই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর যে, ডেমোক্র্যাটদের সর্বাত্মক বিরোধিতার মুখে কোনো আইন টেকসই হবে না। অর্থাৎ, রিপাবলিকানদের কিছু ছাড় দিতে হলেও ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিকভাবে কিছু পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে ট্রাম্প যদি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ক্রিস্টি নোম–কে বরখাস্ত করেন। তিনি তা না করলে, নভেম্বরে ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে তাঁকে অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কোনো ঘটনার পর দায়িত্বশীল নেতৃত্বের উচিত সম্পূর্ণ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জনসাধারণকে চূড়ান্ত রায় থেকে বিরত থাকতে বলা। নোম অন্য ক্ষেত্রে ভালো কাজ করে থাকলেও, সংঘর্ষের পরপরই অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের পক্ষে দাঁড়ানো এবং যেসব মার্কিন নাগরিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তাঁদের চরিত্রহননে জড়িয়ে পড়া চরম দূরদর্শিতার অভাবের পরিচয়। এতে পুরো ব্যবস্থা ও নেতৃত্বের ওপর আস্থা নষ্ট হয়।

দ্বিতীয় বিকল্প হতে পারে ট্রাম্প তথাকথিত 'ড্রিমার'দের জন্য নাগরিকত্বের পথ আবার আলোচনায় আনা। এরা ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস (ডিএসিএ) কর্মসূচির আওতাভুক্ত যাদের শিশুকালে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছিল। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে দু’বার এই ড্রিমারদের জন্য নাগরিকত্বের পথ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বিনিময়ে সীমান্ত দেয়াল নির্মাণে অর্থায়নের শর্তে। ডেমোক্র্যাটরা দুইবারই তা প্রত্যাখ্যান করে।
এখন যেহেতু ট্রাম্প সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছেন, ড্রিমারদের নাগরিকত্বের প্রশ্ন আবার সামনে আনলে কিছু ডেমোক্র্যাট ভোট পাওয়া যেতে পারে।
তাহলে রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে কী থাকা উচিত?
কংগ্রেসকে একটি কার্যকর অভিবাসী–শ্রমিক কর্মসূচি তৈরি করতে হবে যেখানে অভিবাসীরা নিবন্ধন করে বৈধভাবে কাজ করতে পারবেন। দেশ ও বিশেষ করে অর্থনীতির এদের প্রয়োজন।
শুরুতে কংগ্রেস একটি বেসরকারি বা সরকারি–বেসরকারি সংস্থা গঠন করতে পারে, যাদের দায়িত্ব হবে শ্রমিক আবেদনকারীদের যাচাই ও অনুমোদন। সংস্থাটি ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করবে এবং দুই বা তিন বছরের ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদনকারীদের কাছ থেকে কয়েক হাজার ডলার ফি নিয়ে নিজের খরচ তুলবে। এর মাধ্যমে অভিবাসীরা এমন কাজ করতে পারবেন, যেগুলো অনেক মার্কিন নাগরিক করতে চান না। তারা কি এই অর্থ জোগাড় করতে পারবেন? অতীতে বহু অবৈধ অভিবাসী সীমান্তে পৌঁছাতে মাদক চক্র ও মানব পাচারকারীদের জনপ্রতি আনুমানিক ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার ডলার দিয়েছেন কোনো সফলতার নিশ্চয়তা ছাড়াই। যাঁরা মেয়াদ শেষে ভালো অবস্থানে থাকবেন, তাঁরা পুনরায় আবেদন করতে পারবেন।
তবে রিপাবলিকানরা কিছু শর্ত আরোপ করতে চাইবেন। যেমন এই ওয়ার্ক পারমিট নাগরিকত্বের পথ হবে না; নাগরিকত্ব একটি আলাদা প্রক্রিয়া, যার নিজস্ব নিয়ম ও রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে। পারমিটের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব না দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা লাগতে পারে। এসব ব্যক্তি কোনো কল্যাণ সুবিধা পাবেন না যদিও মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, আইনি হোক বা না হোক সব শিশু বিনা মূল্যে সরকারি শিক্ষা পাওয়ার অধিকারী। পাশাপাশি, এসব শ্রমিককে অন্তত মৌলিক (ওবামাকেয়ার ব্যতীত) স্বাস্থ্যবিমার প্রমাণ দিতে হতে পারে।
মূল কথা হলো অভিবাসীরা এখানে কাজ করতে আসবেন, আইন মেনে চলবেন, বেতনভিত্তিক করসহ সব প্রযোজ্য কর পরিশোধ করবেন। তাঁরা মেডিকেয়ার বা সোশ্যাল সিকিউরিটির যোগ্য হবেন না যা উল্টো ওই কর্মসূচিগুলোর আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে—এবং করদাতাদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবেন না। আবেদনকারী সংস্থাকে নিবন্ধিত সব অভিবাসীর ওপর নজরদারি রাখতে হবে। কোনো অভিবাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে, অনুমোদনকারী সংস্থা পারমিট বাতিল করতে পারবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে বহিষ্কার করতে পারবে।
সবশেষে, কংগ্রেস বা প্রশাসন যে কেউ এই কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধনের একটি সীমা নির্ধারণ করতে পারে; তবে সেটি হতে হবে যথেষ্ট বড়। সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ–এর তথ্য অনুযায়ী, 'যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ৮.৩ মিলিয়ন অনিবন্ধিত অভিবাসী কাজ করেন যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৫.২ শতাংশ। তারা নির্মাণখাতে (১৫ লাখ), রেস্তোরাঁয় (১০ লাখ), কৃষি ও খামারে (৩.২ লাখ), ল্যান্ডস্কেপিংয়ে (৩ লাখ), এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও উৎপাদন শিল্পে (২ লাখ) কাজ করেন এ ছাড়াও আরও নানা পেশায়।
তাহলে যারা বহু বছর ধরে অবৈধভাবে দেশে আছেন তাদের কী হবে? কংগ্রেসের সামনে তিনটি পথ খোলা: তাদের যেখানে আছে সেখানেই থাকতে দিয়ে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে দেওয়া; পারমিট ফি–র পাশাপাশি একটি জরিমানা ধার্য করা; অথবা তাদের যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে গিয়ে পরে আবেদন করতে বাধ্য করা।
অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ। লাখো মানুষ এখানে অবৈধভাবে, ছায়ার আড়ালে বসবাস ও কাজ করছেন। রিপাবলিকানদের জন্য দেশের স্বার্থেই জরুরি ভাঙা অভিবাসন ব্যবস্থা ঠিক করা এবং অভিবাসীদের বৈধভাবে কাজ করার একটি বাস্তব পথ তৈরি করা।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি