১৬ এপ্রিল ২০২৬

নতুন নেতৃত্বে অমীমাংসিত উত্তেজনার ছায়া বাংলাদেশে

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
নতুন নেতৃত্বে অমীমাংসিত উত্তেজনার ছায়া বাংলাদেশে

লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সাথে দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছাবেদ সাথী

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে গিয়ে প্রচলিত রীতির বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনের পরিবর্তে তিনি ও তাঁর মন্ত্রিসভা শপথ নেন সংসদ ভবনের উন্মুক্ত ও জনসম্মুখস্থ প্রাঙ্গণে। এটি ছিল দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের একটি প্রতীকী বার্তা—যে প্রশাসনকে অনেকেই প্রযুক্তিনির্ভর, অস্বচ্ছ এবং ক্রমশ জবাবদিহিতাহীন বলে মনে করেছিলেন। কালো স্যুট ও সাদা শার্ট পরে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমাকে পাশে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে হাঁটতে হাঁটতে তিনি যে প্রশান্ত ভাব প্রকাশ করেন, তা তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের মতে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলারই ফল।

তাঁর বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশ পরিচালনা করেছেন। ফলে ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে তারেক রহমানের পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১–২০০৬) তিনি ধীরে ধীরে বিএনপির নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নিতে শুরু করেন। কিন্তু ২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে তিনি লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান। দেশ থেকে দূরে থাকলেও তিনি রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেন এবং ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টি জিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।

শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশি অতিথিদের মধ্যে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলার উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। এটি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে সম্পৃক্ত হওয়ার ভারতের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হয়। শপথের আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফোনে অভিনন্দন জানান এবং সামাজিক মাধ্যমে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশী তরুণ ভোটারদের সমর্থনে একটি স্থিতিশীল ম্যান্ডেট তৈরি হয়েছে। ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম মন্তব্য করেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আদর্শিক অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করেছে এবং জনগণ একটি মধ্যপন্থী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষেই মত দিয়েছে।

Taja Bhabna

পুরোনো উত্তেজনা

স্থিতিশীল বাংলাদেশ ভারতের জন্য ইতিবাচক হলেও গত কয়েক বছরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দেয় বলে ভারতীয় বিশ্লেষকদের ধারণা। শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়াও সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়ায়। সীমান্ত বাণিজ্য সীমিত করা, স্থলবন্দর ব্যবহার কমানো এবং পারস্পরিক বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বড় অংশ প্রভাবিত হয়।

ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প বাতিল, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন—এসব বিষয়ও ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ ও সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যুও সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

নতুন বাস্তবতা

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এবং ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ কৌশলের মধ্যে সম্ভাব্য সমন্বয়ের কথা বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করছেন। তাঁর প্রথম ভাষণে তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করেন এবং সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেন। তবে জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, চীন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের উদ্বেগ এখনো বহাল রয়েছে।

পানি ভাগাভাগির পরীক্ষা

দুই দেশের সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে পানি ভাগাভাগি ইস্যু। তিস্তা ও পদ্মাসহ আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা কূটনৈতিক সাফল্যের সূচনাবিন্দু হতে পারে।

তারেক রহমানের দ্বৈত চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক সংস্কার—এই দুই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ, বিনিয়োগ হ্রাস এবং তরুণদের বেকারত্ব তাঁর সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক সমস্যা। একই সঙ্গে ৮৪ দফা সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়ন এবং সংসদীয় ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বোপরি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হলেও পুরোনো উত্তেজনা পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে নির্বাচনের ফলাফল দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে—যা ভবিষ্যতে সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে এগোতে পারে।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি