হাজার হাজার অভিবাসীকে কার্যত ‘নিখোঁজ’ করে রেখেছে মার্কিন সরকার
ছাবেদ সাথী
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই) -এর হেফাজতে থাকা হাজার হাজার অভিবাসীকে কার্যত ‘নিখোঁজ’ করে রেখেছে মার্কিন সরকার। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
যেসব অভিবাসীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ রয়েছে, তাঁদের নাম আইসিইর অনলাইন ডিটেইনি লোকেটর সিস্টেম (Online Detainee Locator System) থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অনলাইন তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা জানতে পারতেন, তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে।
এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে আইসিইর আটককেন্দ্রে নেওয়া প্রায় ১৬ হাজার অভিবাসীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ ছিল। এই সংখ্যা ওই মাসে আটক হওয়া মোট ব্যক্তির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
কিছু আটক অভিবাসীর অবস্থান গোপন রাখার এই নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযানের গোপনীয়তা ও মানবিক উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে। এর ফলে গুরুতর প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বা ‘ডিউ প্রসেস’ এবং সাংবিধানিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
তবে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে এই ব্যবস্থা সব আটক অভিবাসীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেবল যাঁদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ রয়েছে, তাঁদের তথ্যই অনলাইন ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ হলো অভিবাসন আদালতের বিচারকের দেওয়া এমন একটি আদেশ, যার মাধ্যমে কোনো অনাগরিক ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ থাকলেই একজন অভিবাসীর সব আইনি অধিকার শেষ হয়ে যায় না। অনেকের মামলা পুনরায় চালু করার আবেদন কিংবা অন্যান্য আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকে। নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ সনদের আওতায় কিছু অভিবাসী মানবিক সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্যও হতে পারেন। বিশেষ করে যেসব দেশে ফেরত পাঠানো হলে তাঁদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষ সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে।
অনেক অভিবাসী অনিচ্ছাকৃতভাবে আদালতের নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত হতে না পারার কারণে বহিষ্কারাদেশ পান। কখনো সরকারি নোটিশ ভুল ঠিকানায় পাঠানোর ফলেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এই কারণেই আটক ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করার অনলাইন ব্যবস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আটক অভিবাসী, তাঁদের পরিবার এবং আইনজীবীদের জন্য কার্যত একটি জীবনরক্ষাকারী যোগাযোগমাধ্যম।
পরিবারের সদস্যরা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁদের প্রিয়জনের অবস্থান জানতে পারেন। অন্যদিকে অভিবাসন আইনজীবীরা মক্কেলের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে এবং মামলার প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেন।
কিন্তু শুধু অনলাইন ব্যবস্থা থেকে নাম সরিয়েই থেমে থাকেনি কর্তৃপক্ষ।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিবাসন কর্মকর্তাদের এখন টেলিফোনেও আটক ব্যক্তিদের অবস্থান তাঁদের স্বজন কিংবা আইনজীবীদের জানাতে নিষেধ করা হয়েছে।
ফলে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের সম্পূর্ণ দায়িত্ব কার্যত আটক ব্যক্তিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অথচ আটককেন্দ্র থেকে ফোন করা মোটেও সহজ নয়। ফোনকলের খরচ অনেক সময় বেশি হয়। পাশাপাশি দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয় এবং আটককেন্দ্রের বিভিন্ন বিধিনিষেধও মেনে চলতে হয়।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, কারণ আইসিই নিয়মিত আটক অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে স্থানান্তর করছে। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করে কিছু অভিবাসীকে বহিষ্কারের অভিযোগও উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আটক ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য না পাওয়া তাঁদের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগকে মারাত্মকভাবে সীমিত করতে পারে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন লোকেটর ব্যবস্থা থেকে আটক ব্যক্তিদের তথ্য সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিজেই আইনবিরোধী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অনুযায়ী, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন, স্বাধীনতা কিংবা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
কোনো আইনজীবী যদি তাঁর মক্কেলকে কোথায় আটক রাখা হয়েছে, সেটিই জানতে না পারেন, তাহলে কার্যকরভাবে আইনি প্রতিনিধিত্ব করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যবস্থা ‘হেবিয়াস করপাস’ বা আটকাদেশের বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জ করার মৌলিক আইনি প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
হেবিয়াস করপাস এমন একটি সাংবিধানিক সুরক্ষা, যার মাধ্যমে আটক ব্যক্তিরা আদালতের কাছে তাঁদের আটকাদেশের বৈধতা যাচাইয়ের আবেদন করতে পারেন। এই অধিকার কেবল মার্কিন নাগরিকদের জন্য নয়; নির্দিষ্ট আইনি শর্তে অনাগরিক ব্যক্তিরাও এর আশ্রয় নিতে পারেন।
আইনি যুক্তির বাইরেও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান গোপন রাখাকে কীভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা যায়?
রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের অবস্থান গোপন করার ঘটনা সাধারণত উত্তর কোরিয়া কিংবা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
যেসব মার্কিন নাগরিক সরকারের ভেতরে অস্বচ্ছ ক্ষমতাকাঠামো বা তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, সমালোচকদের মতে, এই নীতি তাঁদের উদ্বেগের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে আইসিই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যেসব আটক অভিবাসীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ রয়েছে, তাঁদের দ্রুত দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তির বহিষ্কার কার্যক্রম স্থগিত করে আদালত থেকে নজিরবিহীন সংখ্যক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে।
এই বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত মে মাস পর্যন্ত ফেডারেল বিচারকেরা আইসিই-সংক্রান্ত ২০ হাজারের বেশি মামলায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু আদালতের এত বিপুলসংখ্যক সিদ্ধান্ত যদি আইসিইর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে তার সমাধান আটক ব্যক্তিদের শনাক্ত করা আরও কঠিন করে তোলা হতে পারে না।
বরং আইসিইর উচিত নিজেদের কার্যক্রম সংস্কার করে আইন ও আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এই সংকটের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
চলতি বছর আইসিইর আটককেন্দ্রগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন কিছু অভিবাসীকে আফ্রিকার এসওয়াতিনি ও রুয়ান্ডার মতো তৃতীয় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো আইনজীবী যদি আটক মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন, তাহলে তার পরিণতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
কেউ হয়তো আদালতে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ হারাবেন। কেউ প্রয়োজনীয় আইনি প্রতিকার চাইতে পারবেন না। আবার কেউ এমন একটি দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, যেখানে তাঁর জীবন কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
এই বাস্তবতায় আটক অভিবাসীদের অবস্থান জানার অধিকার শুধু প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এদিকে সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোর ইঙ্গিত অনুযায়ী, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
যদি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান, তাহলে আইনপ্রণেতাদের নিশ্চিত করা উচিত যে আইসিইর হেফাজতে থাকা প্রত্যেক অভিবাসীর নাম ও অবস্থান অনলাইন লোকেটর ব্যবস্থায় সঠিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে আইন করে এই তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে। কোনো আটক ব্যক্তিকে এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হলে তাঁর আইনজীবীকে দ্রুত অবহিত করার বিধানও চালু করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন আইন কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে আটক ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষা উপেক্ষা করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের হেফাজতে থাকা মানুষের অবস্থান গোপন রাখা কিংবা তাঁদের কার্যত ‘নিখোঁজ’ করে দেওয়ার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।
কারণ আইনের শাসনের মূল ভিত্তিই হলো—রাষ্ট্র যত শক্তিশালী হোক না কেন, তার প্রতিটি পদক্ষেপ সংবিধান ও আইনের অধীন থাকতে হবে।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসাধারী শিক্ষকদের নিষিদ্ধ করা বিপর্যয় ডেকে আনবে
সঙ্গীত একাডেমি