২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসাধারী শিক্ষকদের নিষিদ্ধ করা বিপর্যয় ডেকে আনবে

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসাধারী শিক্ষকদের নিষিদ্ধ করা বিপর্যয় ডেকে আনবে

কর্মভিসা এইচ-১বি নিয়ে কোনো ব্যক্তিকে সরকারি স্কুলে নিয়োগ দেওয়া যাবে না

ছাবেদ সাথী

টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট (রিপাবলিকান) চান, তাঁর অঙ্গরাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোতে এইচ-১বি ভিসায় কর্মরত মানুষের সংখ্যা হোক ‘ঠিক শূন্য’।

নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া তাঁর এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বিশেষায়িত কর্মভিসা এইচ-১বি নিয়ে কোনো ব্যক্তিকে সরকারি স্কুলে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এতে নতুন নিয়োগের পাশাপাশি বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এটি টেক্সাসের জন্য বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন হবে। কারণ ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো অঙ্গরাজ্যের তুলনায় টেক্সাসেই কে-১২ শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

অ্যাবট তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে ‘বিদেশি প্রভাব’ থেকে সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে আরও বাস্তব একটি আশঙ্কা—হাজার হাজার শিক্ষার্থী যোগ্য শিক্ষকের পাঠদান থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এইচ-১বি শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল ডালাস ইন্ডিপেনডেন্ট স্কুল ডিস্ট্রিক্ট বিষয়টি সরাসরি তুলে ধরেছে: এসব শিক্ষক চলে গেলে শূন্যস্থান পূরণে আরও বেশি টেক্সান শিক্ষক প্রয়োজন হবে।

কিন্তু সমস্যা হলো, টেক্সাসে যোগ্য শিক্ষকের সরবরাহ এমনিতেই কমে আসছে।

আমরা দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জপূর্ণ স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট এবং সেই সংকট মোকাবিলায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা করেছি। আমাদের গবেষণার ফলাফল দেখায়, গভর্নরের এই প্রস্তাব শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

তিন দশকের গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষকদের যোগ্যতার তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি শিক্ষকসংকটে থাকা স্কুলগুলোতে STEM—বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত—শিক্ষকদের যোগ্যতার মান মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে; এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সামান্য উন্নতিও হয়েছে।

এটি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা পেশায় অংশগ্রহণ ৫০ বছরের মধ্যে নিম্নপর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমেছে এবং অন্যান্য পেশার তুলনায় শিক্ষকদের বেতনও পিছিয়ে পড়েছে। তাহলে স্টেম (STEM) শিক্ষকদের মান কীভাবে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে? উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন স্কুলগুলো বিকল্প পথ খুঁজেছে।

বিদেশে প্রশিক্ষিত শিক্ষকেরা সংকট সামলেছেন

বিদেশে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষকসংকট মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে। উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন স্কুলগুলোর স্টেম শিক্ষকশক্তিতে বিদেশি শিক্ষকদের অংশ ১৯৯৩ সালের প্রায় ১ শতাংশ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৬ শতাংশের বেশি হয়েছে।

বিশেষ করে যেখানে শিক্ষকসংকট সবচেয়ে তীব্র—উচ্চ দারিদ্র্যপীড়িত শহুরে ও গ্রামীণ এলাকার গণিত, বিজ্ঞান, বিশেষ শিক্ষা এবং বিদেশি ভাষার ক্লাসে—সেখানে তাঁদের উপস্থিতি বেশি।

আমাদের গবেষণা আরও দেখিয়েছে, বিদেশে প্রশিক্ষিত শিক্ষকেরা গড়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকর্মীদের তুলনায় শিক্ষাগত যোগ্যতার কিছু সূচকে এগিয়ে রয়েছেন। গবেষণায় বিদেশি শিক্ষকদের ৭৯ শতাংশের  স্টেম বিষয়ে ডিগ্রি ছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬৮ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে উচ্চতর ডিগ্রিধারীর হারও তুলনামূলক বেশি ছিল।

অভিবাসী শিক্ষকদের নিয়ে আমাদের বিস্তারিত গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁরা নিম্নমানের বিকল্প শিক্ষক নন। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক, যাঁদের এমন স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যেখানে স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত আবেদনকারী পাওয়া কঠিন।

নিষেধাজ্ঞার পরিণতি কী হতে পারে

এইচ-১বি শিক্ষক নিষিদ্ধ করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাইরে শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা বাড়তে পারে।

কিন্তু টেক্সাসে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর একটি হলো—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়াই কর্মী নিয়োগ।

২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে টেক্সাসে নতুন যোগ দেওয়া শিক্ষকদের অর্ধেকেরও বেশি কোনো শিক্ষক সনদ ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী, এ ধরনের শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের শেখার ফল তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

ফলে এইচ-১বি নিষেধাজ্ঞা এমন একটি প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে, যেখানে যোগ্য বিদেশি শিক্ষকের পরিবর্তে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণহীন কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়বে।

‘বিদেশি প্রভাব’ নিয়ে অ্যাবটের উদ্বেগ

এবার দেখা যাক গভর্নর অ্যাবটের উত্থাপিত “বিদেশি প্রভাবের” আশঙ্কাটি।

তিনি কাতারের সহায়তাপ্রাপ্ত একটি আরবি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি এবং চীনের সহায়তাপ্রাপ্ত ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষার উদাহরণ দিয়েছেন। এসব কর্মসূচি নিয়ে নীতিগত বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে টেক্সাসের খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষক যুক্ত।

অন্যদিকে ফিলিপাইন বা মেক্সিকো থেকে আসা অনেক সনদপ্রাপ্ত শিক্ষকের বিষয়ে অ্যাবট একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। কিন্তু সামগ্রিক এইচ-১বি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তাঁরাও এর আওতায় পড়বেন।

এইচ-১বি বন্ধ হলে জে-১-এর ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এইচ-১বি বন্ধ করলেই আন্তর্জাতিক শিক্ষক নিয়োগের চাহিদা শেষ হয়ে যাবে না।

বরং স্কুলগুলো জে-১ ভিসার দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে। এই ভিসা মূলত সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জন্য তৈরি, দীর্ঘমেয়াদি শ্রমিকসংকট সমাধানের জন্য নয়।

অর্থাৎ এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং একটি কর্মভিসার জায়গায় অপেক্ষাকৃত স্বল্পমেয়াদি ও অনিশ্চিত আরেকটি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষক পরিবর্তনের হারও বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।

বিদেশি শিক্ষকের ওপর স্থায়ী নির্ভরতাও সমাধান নয়

তার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলো অনির্দিষ্টকাল আন্তর্জাতিক শিক্ষক নিয়োগের ওপর নির্ভর করবে।

আমরা আগেও এই নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে লিখেছি। ভিসার সঙ্গে শিক্ষকদের চাকরি ও অবস্থান যুক্ত থাকার অনিশ্চয়তা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে সেরা শিক্ষকদের নিয়ে আসার নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। একই সঙ্গে মহামারি, কূটনৈতিক সংকট অথবা অত্যধিক ভিসা ফি হঠাৎ আন্তর্জাতিক শিক্ষক সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।

সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হওয়া উচিত দেশের ভেতরেই শক্তিশালী শিক্ষক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সমাধান দেশীয় শিক্ষক তৈরিতে বিনিয়োগ

এ জন্য ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের রবার্ট নয়েস-এর মতো কর্মসূচির সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। আমাদের গবেষণা অনুযায়ী, এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষকদের যোগ্যতা ও সরবরাহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

টেক্সাসে শুরু হওয়া ইউটিচ কর্মসূচিও বর্তমানে এক ডজনের বেশি অঙ্গরাজ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং স্টেম (STEM) শিক্ষক তৈরির পথ সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে।

নীতিনির্ধারকদের একই সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। যেসব বিষয় ও স্কুলে শিক্ষকসংকট সবচেয়ে বেশি, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

সবশেষে, যেসব প্রতিকূল কর্মপরিবেশের কারণে শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, সেগুলোরও সমাধান করতে হবে।

টেক্সাসের শিক্ষক সরবরাহ ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চাপের মুখে এবং নতুন শিক্ষকদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছেন। এই পরিস্থিতিতে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন স্কুলগুলোর একটি অংশ যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষকসংকট সামাল দিচ্ছে।

সেই বাস্তবতায় এইচ-১বি শিক্ষকদের একযোগে বাদ দেওয়ার নীতি শিক্ষকসংকটের মূল কারণের সমাধান করবে না। বরং লেখকদের যুক্তি অনুযায়ী, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে সেই সব স্কুল ও শিক্ষার্থী, যাদের যোগ্য শিক্ষকের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস। 

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি