কর্মশক্তি ও অর্থনীতির ক্ষতি করছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন নীতি
ছাবেদ সাথী'র তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের প্রকাশিত কর্মসংস্থান প্রতিবেদন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতিবিদেরা যেখানে ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করেছিলেন, সেখানে জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মোট চাকরির সংখ্যা বরং ২৩ হাজার কমেছে। একই সঙ্গে মে ও জুন মাসের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হিসাব সংশোধন করে সম্মিলিতভাবে আরও এক লাখ কমানো হয়েছে। বিস্ময়করভাবে, যুক্তরাষ্ট্র যেন আবার ২০২৫ সালের প্রায় স্থবির কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির অবস্থায় ফিরে গেছে।
এই তথ্য আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আরেকটি বিস্ময়কর চিত্র সামনে আসে। কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়লেও গত দুই মাসে বেকারত্বের হার ৪.৩ শতাংশ থেকে কমে ৪.১ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু বেকারত্বের এই হ্রাস নতুন চাকরি বৃদ্ধির কারণে নয়; বরং কাজ খুঁজছেন—এমন মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার ফল। গত দুই মাসেই প্রায় ১০ লাখ মানুষ শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন এবং গত এক বছরে এই সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ।
কেন সংকুচিত হচ্ছে শ্রমশক্তি?
বেবি বুমার প্রজন্মের অবসর গ্রহণ অবশ্যই এর একটি কারণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কর্মক্ষম প্রধান বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কমেছে। এর পাশাপাশি শ্রমশক্তি সংকুচিত হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন নীতি।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ও ব্যাপক নির্বাসন নীতি, বিভিন্ন অভিবাসী গোষ্ঠীর টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস (TPS) বাতিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর বিদেশি শিক্ষার্থী কম ভর্তির চাপ—এসব কারণে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অভিবাসীদের একটি অংশ দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে নতুন অভিবাসীর আগমনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
চলতি বছরের শুরুতে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিট অভিবাসন ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে যেতে পারে, যার ফলে দেশটির শ্রমশক্তি ও অর্থনীতি উভয়ই সংকুচিত হবে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য সেই পূর্বাভাসেরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
সর্বশেষ কর্মসংস্থান প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে শ্রমশক্তি যে পরিমাণ কমেছে, তার প্রায় অর্ধেকই অভিবাসীদের সংখ্যা হ্রাসের কারণে। বাস্তবে শ্রমবাজারে অভিবাসীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব আরও বেশি হতে পারে। কারণ কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের জন্য পরিচালিত জরিপে অনেক অভিবাসীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয় না।
অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
ব্রুকিংসের প্রতিবেদনে নিট অভিবাসন ঋণাত্মক হয়ে পড়লে অর্থনীতিতে যে বহুমুখী ক্ষতি হতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছিল। বর্তমানে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও সেই ক্ষতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত তিন প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেশ দুর্বল ছিল। শ্রমিকের ঘাটতি শ্রম ব্যয় ও পণ্যমূল্য বাড়াতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এটি আমেরিকানদের প্রত্যাশিত ‘সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা’র ঠিক বিপরীত।
অর্থনীতিতে অভিবাসন হ্রাসের প্রভাব অনেকটা শুল্ক বৃদ্ধি কিংবা ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো। অর্থনীতিবিদেরা এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘সাপ্লাই শক’ বা সরবরাহজনিত ধাক্কা বলে থাকেন—যেখানে একই সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ে এবং অর্থনৈতিক উৎপাদন দুর্বল হয়ে পড়ে।
অভিবাসীনির্ভর খাতগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল অর্থনৈতিক খাতগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
কৃষি, গৃহস্থালি সেবা, অবকাশ ও আতিথেয়তা খাতে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী কাজ করেন—এটি বহুল পরিচিত। কিন্তু অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকৌশলী ও কারিগরি পেশাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিবাসী কর্মরত রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও প্রবীণদের পরিচর্যা খাতে চাহিদা বাড়ছে। এই চাহিদা পূরণে অভিবাসী কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একইভাবে দেশজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে নির্মাণশিল্পেও দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
এসব ক্ষেত্রে কাজ করার মতো অভিবাসীর সংখ্যা কমে গেলে নতুন উৎপাদন ও অবকাঠামো নির্মাণের গতি কমবে এবং ব্যয় বাড়বে।
সমাধানের পথ কী?
এই সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যেতে পারে? ট্রাম্প প্রশাসন বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অভিবাসন কমানোর ওপর যেভাবে জোর দিচ্ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে হোয়াইট হাউস থেকে ভিন্ন কোনো নীতি আসবে—এমন প্রত্যাশা করা কঠিন।
তবে কংগ্রেসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের এখন থেকেই এমন একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করা উচিত, যার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
ন্যায্যভাবে বলতে গেলে, বাইডেন প্রশাসনের চার বছরের অধিকাংশ সময়ে দক্ষিণ সীমান্তে যে অকার্যকর পরিস্থিতি এবং অবৈধ অভিবাসনের ব্যাপক প্রবাহ দেখা গিয়েছিল, সেখানে ফিরে যাওয়াও সমাধান নয়। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী মনে করেই অনেক আমেরিকান আংশিকভাবে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন।
এর পরিবর্তে পারিবারিক পুনর্মিলন কিংবা কেবল অভিবাসীবান্ধব আবেগকে ভিত্তি না করে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে একটি বাস্তবসম্মত অভিবাসন নীতি গড়ে তোলা উচিত।
যেখানে শ্রমিকের ঘাটতি, সেখানে বেশি ভিসা
এ ধরনের অভিবাসন নীতিতে যেসব খাতে শ্রমিকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি অথচ পর্যাপ্ত কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না, সেসব খাতের জন্য বিদেশি কর্মীদের বেশি ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে প্রকৌশল ও কারিগরি পেশা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রবীণ পরিচর্যা এবং দক্ষ নির্মাণ পেশা।
একই সঙ্গে অভিবাসীদের শ্রমবাজারে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়নে বেশি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। অবশ্য একই ধরনের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী কর্মীদের জন্যও নিশ্চিত করা উচিত। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে অভিবাসীদের অবদান আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
একটি কার্যকর নীতিতে অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে বৈধ অভিবাসনের পথ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে নথিপত্রহীন বা অনিবন্ধিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীদের জন্য বৈধ মর্যাদা অর্জনের একটি বাস্তবসম্মত পথও তৈরি করা যেতে পারে।
নতুন নয়, কিন্তু এখন আরও জরুরি
অবশ্য এ ধরনের উদ্যোগ একেবারেই নতুন নয়। অতীতেও একই ধরনের অভিবাসন সংস্কারের প্রস্তাব বিবেচিত হয়েছে। সর্বশেষ বড় উদ্যোগগুলোর একটি ছিল ২০১৩ সালের দ্বিদলীয় অভিবাসন সংস্কার বিল। বিলটি সিনেটে ৬৮ ভোটে পাস হলেও প্রতিনিধি পরিষদে শেষ পর্যন্ত আর এগোতে পারেনি।
বিশেষ করে ২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রথম নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন গত এক দশকে এ ধরনের উদ্যোগকে অনেকটাই স্তব্ধ করে দিয়েছে।
কিন্তু এখন বাস্তবতা বদলাচ্ছে। বেবি বুমাররা ক্রমেই অবসরে যাচ্ছেন, কম জন্মহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে একটি অকার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থার অর্থনৈতিক মূল্য এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
তাই আবেগনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অভিবাসন নিয়ে নতুন বাস্তবতা কল্পনা করতে হবে। আর সেই বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করা উচিত এখনই।
ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বাংলা প্রেস-এর সম্পাদক।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ ও ‘মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি’ বাতিল সরকারের গণবিরোধী সিদ্ধান্ত
১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৩ আগস্ট : সততা আর মেধাবী রাজনীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত আনোয়ার জাহিদ
সঙ্গীত একাডেমি