মহান আমেরিকায় এত তরুণ কেন মারা যাচ্ছেন?
ছাবেদ সাথী'র কলাম আমেরিকার ভেতরে বাইরে
ছাবেদ সাথী
আমাদের প্রতিনিয়ত বলা হয়, আমেরিকাই নিঃসন্দেহে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশ। এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুললে অনেকে বিরক্ত হন, সমালোচনাও কম হয় না। তবু প্রশ্নটি আমাদের তুলতেই হবে।
আমেরিকা যদি এতই মহান হয়, তাহলে এত তরুণ কেন মারা যাচ্ছেন?
ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী আমেরিকানদের মৃত্যুহার বেড়েছে ৭১ দশমিক ২ শতাংশ। যে বয়সে মানুষের সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা, সেই বয়সেই তাঁরা মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন।
অন্তত তাত্ত্বিকভাবে, চিরাচরিত আমেরিকান জীবনপথটি খুবই সহজ। তরুণদের বলা হয়—পড়াশোনা করো, কর্মজীবনে উন্নতি করো, থিতু হও, পরিবার গড়ে তোলো এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করো যেন বিবাহবিচ্ছেদ না হয়।
কিন্তু মৃত্যুর পরিসংখ্যান বলছে, মানুষ যখন এই পথ অনুসরণ করতে শুরু করেন, ঠিক তখনই পরিকল্পনাটি ভেঙে পড়ে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে একজন ৮০ বছর বয়সী মানুষের আয়ু আরও কয়েক মাস বাড়াতে আমেরিকা অসাধারণ দক্ষ। অথচ একই সময়ে একজন ৩২ বছর বয়সী মানুষকে তাঁর সন্তানদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পা রাখতে দেখা পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে দেশটি বারবার ব্যর্থ হয়।
এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রভাব ময়নাতদন্তের কক্ষের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। একটি অকালমৃত্যু গোটা পরিবারকে তছনছ করে দেয়। খাবার টেবিলে প্রিয়জনের শূন্য আসন দেখতে দেখতে শিশুরা বড় হয়। যে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বাবা-মায়ের বার্ধক্যের পরিচর্যার ব্যবস্থা করার কথা ছিল, সেই সন্তানকেই বাবা-মায়ের দাফন করতে হয়। চুলে প্রথম পাক ধরার আগেই নারী-পুরুষ জীবনসঙ্গী হারান। সমাজ হারায় প্লাম্বার, শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রতিবেশীদের—যাঁদের আরও ৩০ বছর স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখার কথা ছিল।
তরুণদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠলেই জনআলোচনা প্রায়ই ফেন্টানিল সংকটে গিয়ে ঠেকে। অবৈধ কৃত্রিম ওপিওয়েড নিঃসন্দেহে অসংখ্য প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। তবে অতিরিক্ত মাদক গ্রহণ পুরো চিত্রের একটি অংশ মাত্র। নিজের আচরণ থেকে সৃষ্ট বিপদ ও শারীরিক রোগের এক অদ্ভুত মিশ্রণে তরুণ আমেরিকানরা মারা যাচ্ছেন। আত্মহত্যার হার এখনো বেশি। অতিরিক্ত মদ্যপানজনিত যকৃতের রোগ, প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ড, উচ্চ রক্তচাপ এবং বিপাকীয় সমস্যাও বিশ ও ত্রিশের কোঠায় থাকা মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।
যেসব রোগকে একসময় জীবনের ভারে ক্লান্ত অবসরপ্রাপ্তদের অসুখ বলে ভাবা হতো, সেগুলো এখন এমন মানুষের শরীরে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা এখনো হাইস্কুলের শরীরচর্চার ক্লাসের লকারের গোপন নম্বর মনে করতে পারেন। উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভার উদ্বেগজনক গতিতে কম বয়সীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণদের শরীরেই দেখা যাচ্ছে ৬০ বছর বয়সীদের মতো ক্ষয়ক্ষতির লক্ষণ।
আধুনিক রাজনৈতিক ভাষ্যে দেশের প্রতিটি সমস্যার জন্য ব্যবস্থাগত ব্যর্থতাকে দায়ী করার প্রবণতা রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা অবশ্যই আছে। তবে এই সংকটের বড় একটি অংশ ব্যক্তিগত অভ্যাসের সঙ্গেও সম্পর্কিত। চিকিৎসাবিজ্ঞান গুলির ক্ষত সারাতে এবং বন্ধ ধমনির বাধা দূর করতে পারে; কিন্তু কাউকে সপ্তাহে এক গ্যালন ভদকা পান করা বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে না। বরফে ঢাকা আন্তঃরাজ্য মহাসড়কে কেউ যখন মিম পাঠাতে পাঠাতে ঘণ্টায় ৯০ মাইল গতিতে গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন প্রযুক্তিও তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারে না। অতি প্রক্রিয়াজাত জাঙ্ক ফুড খাওয়া, দীর্ঘ সময় বসে পর্দায় ডুবে থাকা, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা না করানোর মতো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কোনো সরকারি সংস্থা খুঁটিনাটি নিয়ন্ত্রণ করে দূর করতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর স্বাস্থ্যসেবায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে—অন্য যেকোনো ধনী দেশের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ এই বিপুল বিনিয়োগের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে কমতে থাকা গড় আয়ু। ইউরোপের দেশগুলো আমেরিকার ব্যয়ের একটি অংশ খরচ করেও তাদের নাগরিকদের নিয়মিত আশি ও নব্বইয়ের কোঠা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে দেখছে, উন্নত জৈবভিত্তিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করেই। প্রতিদিন নিজের যত্ন নেওয়া ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের বিকল্প হিসেবে উচ্চপ্রযুক্তির চিকিৎসা মোটেও যথেষ্ট নয়।
ভৌগোলিক অবস্থানও ঝুঁকি বাড়ায়, কখনো কখনো যা প্রায় খামখেয়ালি বলে মনে হয়। একটি জিপ কোড এলাকায় জন্ম নেওয়া শিশুর প্রত্যাশিত আয়ু মাত্র ৫০ মাইল দূরে জন্ম নেওয়া আরেক শিশুর চেয়ে ১০ বছর বেশি হতে পারে। স্থানীয় অর্থনীতি, আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতি, ধূমপানের অভ্যাস এবং গুরুতর আঘাতের জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ—এসব কারণে এক অঙ্গরাজ্য থেকে অন্য অঙ্গরাজ্যে বেঁচে থাকার সম্ভাবনায় বড় পার্থক্য তৈরি হয়। এই বৈষম্য স্থানীয় কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও দৈনন্দিন অভ্যাসের কঠিন বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। উচ্চগতির ইন্টারনেট ও অফুরন্ত স্ট্রিমিং বিনোদনের বিস্তারের পাশাপাশি মুখোমুখি মানবিক যোগাযোগ ব্যাপকভাবে কমেছে। তরুণদের অনলাইনে হাজার হাজার অনুসারী আছে, অথচ ছোটখাটো চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ নেই। দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানসিক চাপের হরমোন বাড়ায় এবং ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। এটি শরীরে প্রদাহ বাড়ায় এবং মানুষকে মদ, তীব্র আসক্তি সৃষ্টিকারী মাদক ও আত্মক্ষতির মতো ধ্বংসাত্মক আচরণের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রচলিত জনস্বাস্থ্য কাঠামোয় মৃত্যুর প্রতিটি কারণকে আলাদা ঘটনা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়। একটি বিভাগ আসক্তি নিয়ে কাজ করে, আরেকটি হৃদ্রোগের হিসাব রাখে, তৃতীয়টি সড়কনিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করে। এই আমলাতান্ত্রিক বিভাজনে বৃহত্তর প্রবণতাটি চোখ এড়িয়ে যায়। সম্পূর্ণ ভিন্ন একাধিক কারণে যখন একই বয়সী জনগোষ্ঠীর মৃত্যুহার একসঙ্গে বাড়ে, তখন বুঝতে হয়, সংস্কৃতির ভেতরেই এমন কিছু তৈরি হচ্ছে, যা চিকিৎসক কিংবা কঠোর ভাষায় লেখা নীতিমালা দিয়ে ঠিক করা যায় না।
একটি সুস্থ সমাজের মৌলিক সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত—সাধারণ একজন নাগরিক স্বাভাবিকভাবে বয়স বাড়িয়ে দাদা-দাদি বা নানা-নানি হওয়ার সুযোগ পান কি না। একের পর এক অকালমৃত্যুর শোকসংবাদের মধ্য দিয়ে আমেরিকা সেই পরীক্ষায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি