সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালাচ্ছেন ট্রাম্প
ছাবেদ সাথী'র তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
দুই সপ্তাহ আগে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগ, যথাযথ তদারকির অভাবে পত্রিকাটির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং কোম্পানিতে অঙ্গরাজ্যের পেনশনভোগীদের বিনিয়োগ করা শেয়ারের মূল্য কমেছে।
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার গাজা যুদ্ধ নিয়ে পত্রিকাটির প্রতিবেদনকে তাঁর ভাষায়, ‘ভুল ও পক্ষপাতদুষ্ট হামাসপন্থী সংবাদ পরিবেশন’ বলে আক্রমণ করেছেন। টাইমসের জবাব, মামলাটিকে যদিও ‘কোম্পানির হিসাবপত্র ও নথি পরিদর্শনের জন্য করপোরেট পরিচালনাসংক্রান্ত আবেদন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আসলে এটি ‘প্রথম সংশোধনীতে সুরক্ষিত সাংবাদিকতাকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখার প্রকাশ্য চেষ্টা’।
মামলায় জয়লাভই হয়তো মূল উদ্দেশ্য নয়। মামলার প্রক্রিয়াই টাইমসের সুনাম ক্ষুণ্ন করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে পত্রিকাটিকে সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করে। আর পরবর্তী নিশানা হওয়ার আশঙ্কাই অন্য সংবাদমাধ্যমকে বশ মানতে উৎসাহিত করতে পারে।
পরিহাসের বিষয় হলো, ট্রাম্প ও তাঁর মিত্ররা বছরের পর বছর অভিযোগ করেছেন যে তাঁর বামপন্থী সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক সম্ভাবনা নষ্ট করতে এবং রক্ষণশীলদের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করতে আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। ডেমোক্র্যাটদের এই তথাকথিত “আইনি যুদ্ধ” বা ‘লফেয়ার’ দেখে তিনি “স্তম্ভিত” বলে দাবি করেছিলেন। একে তিনি ‘নোংরা’, “বিদ্বেষপূর্ণ” এবং “তৃতীয় বিশ্বের” কৌশলও বলেছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর আবার ক্ষমতায় ফেরার কিছুদিন আগে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ‘আইনি যুদ্ধের অবসান হয়েছে।’ কিন্তু এখন এই আইনি যুদ্ধ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করছে।
ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানশাসিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে তাঁর মিত্ররা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের জন্য আইনি ও নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের এক বিশাল জাল তৈরি করেছেন। তাঁদের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে মামলা, সমন, তল্লাশি পরোয়ানা, অর্থায়ন বন্ধের হুমকি, সম্প্রচার লাইসেন্স পর্যালোচনা, প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত। প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করছেন, তাঁদের লক্ষ্য হলো ‘সর্বক্ষেত্রে পূর্ণ আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘গণমাধ্যমের পরিসরকে নতুনভাবে সাজানো’।
আমাদের গণতন্ত্রের অপরিহার্য স্তম্ভ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যেই ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে ‘আমেরিকার জনগণের শত্রু’ বলেছিলেন। হোয়াইট হাউসে ফিরে তিনি “ব্যাপক ও পরিকল্পিত মানহানির” অভিযোগে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মামলা করেছেন। জেফ্রি এপস্টিনকে তিনি পাঠিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি অশ্লীল জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জন্য দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে করেছেন ১ হাজার কোটি ডলারের মামলা। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে একটি তথ্যচিত্রের জন্য বিবিসির বিরুদ্ধে করেছেন আরও ১ হাজার কোটি ডলারের মামলা।
অ্যাক্সিওসের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর ট্রাম্প, তাঁর প্রশাসন এবং তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গণমাধ্যম ও মানহানিসংক্রান্ত ১৬টি মামলায় জড়িত ছিল। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে আরও নয়টি মামলা। সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আগের অনেক মামলা প্রথম সংশোধনীর সুরক্ষার ভিত্তিতে খারিজ হয়েছে। একটি মামলায় তাঁকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের আইনি খরচ বাবদ প্রায় ৪ লাখ ডলার পরিশোধের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মামলাগুলো বৃহত্তর অভিযানের সামান্য অংশমাত্র। ‘কাল্পনিক সংবাদ ও মিথ্যা’ প্রচারের অভিযোগে তিনি সিএনএন, এমএস নাউ এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এর আগে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রবেশাধিকার বন্ধ করেছিলেন। প্রতিরক্ষা দপ্তরও পেন্টাগনে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে এবং তাদের প্রেস অফিসে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
ট্রাম্প এবিসিকে কৌতুকাভিনেতা ও তাঁর সমালোচক জিমি কিমেলকে বরখাস্ত করার দাবি জানানোর পরদিনই ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন বা এফসিসি এবিসির সব টেলিভিশন স্টেশনের লাইসেন্স দ্রুত পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়। স্বাভাবিক নিয়মে এসব লাইসেন্স ২০২৮ সাল বা তারও পরে নবায়নের জন্য বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল। কমিশন আগে কখনো এত ব্যাপক পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়নি। তবে তাদের দাবি, এই পদক্ষেপ এবিসির বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিসংক্রান্ত নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এবিসি দ্রুত এফসিসির বিরুদ্ধে মামলা করে। প্রতিষ্ঠানটি এই পর্যালোচনাকে ‘তাদের সাংবাদিকদের প্রকাশিত সংবাদ এবং নেটওয়ার্কের অনুষ্ঠানে প্রচারিত মতামতের’ কারণে ‘প্রকাশ্য প্রতিশোধ’ বলে অভিহিত করেছে।
এফসিসি বড় সম্প্রচার নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে ‘সংবাদ বিকৃতি’ এবং সংস্থাটির বিবেচনায় সম্ভাব্য বেআইনি বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিসংক্রান্ত নীতি নিয়েও তদন্ত করেছে।
ফেডারেল ট্রেড কমিশন বা এফটিসি অনলাইনে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে। এতে ব্যয় বাড়ছে, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেরাই নিজেদের প্রকাশিত বক্তব্য সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিচার বিভাগ কয়েকজন সাংবাদিক এবং তাঁদের স্বজনদের ফোনের রেকর্ড তলব করেছে। আবার গোপনীয় তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করার সন্দেহে এক সরকারি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তদন্তের অংশ হিসেবে এফবিআইয়ের এজেন্টরা ওয়াশিংটন পোস্টের এক নারী সাংবাদিকের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য যন্ত্র জব্দ করেছেন—যদিও ওই সাংবাদিক তদন্তের লক্ষ্য ছিলেন না।
আদালত এসব কৌশলের অনেকগুলো প্রত্যাখ্যান করলেও অভিযান ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। রিপাবলিকানশাসিত অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকারও এতে যোগ দিচ্ছে। ২০২৩ সালে টেক্সাস ও ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেলরা উদারপন্থী গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক সংস্থা মিডিয়া ম্যাটার্সের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। দৃশ্যত ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের উৎসাহেই তাঁরা এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে ফ্লোরিডার শেয়ারহোল্ডার অধিকারসংক্রান্ত মামলা শেয়ারের মালিকানাকে সম্পাদকীয় কার্যক্রম তদন্তের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ডানপন্থীদের এই অভিযান প্রচলিত আইনি যুদ্ধের মতো নয়। আদালতে জয়লাভের ওপর এটি নির্ভর করে না। এবিসি ও সিবিএসের মূল কোম্পানিগুলো অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ মামলা নিষ্পত্তিতে লাখ লাখ ডলার দিয়েছে—একটি ছিল মানহানির মামলা, অন্যটি ‘প্রতারণামূলক সম্পাদনার’ অভিযোগে। সম্ভবত বড় করপোরেট লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছিল বলেই তারা এই অর্থ দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতি ট্রাম্পের বার্তা স্পষ্ট: সমালোচনামূলক সংবাদ পরিবেশনের মূল্য এখন আইনজীবীর ফি ছাড়াও আরও অনেকভাবে দিতে হবে।
আইনি যুদ্ধ সম্পর্কে ট্রাম্পের কথাটি ঠিক ছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিতে ব্যবহার করা হলে এটি একটি ‘নোংরা’ কৌশল হতে পারে। কিন্তু মামলাকারীর নিয়ন্ত্রণে যখন বিচার বিভাগ, পেন্টাগন, এফসিসি, এফটিসি এবং হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকারসহ সরকারের গোটা ব্যবস্থা থাকে, তখন এই আইনি যুদ্ধ আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আমরা নির্ভর করি, তাদের অস্তিত্বই তখন হুমকির মুখে পড়ে।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসাধারী শিক্ষকদের নিষিদ্ধ করা বিপর্যয় ডেকে আনবে
সঙ্গীত একাডেমি