অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড: আইফোন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা তুহিনের, হত্যাও তার নির্দেশে
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে সাইফুল ইসলাম তুহিনকে (১৯) মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তুহিনই করে এবং তার নির্দেশেই হত্যাকাণ্ডে অন্যরা জড়ায়।
অপ্রতিম হত্যার পরদিন তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। তখনও তার মরদেহ উদ্ধারের খবর তদন্তকারীদের কাছে পৌঁছায়নি। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পুলিশের কাছে আসে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। পরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শনিবার রাত ৮টার দিকে সে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। তবে সহযোগীদের নাম বলতে সে অনীহা দেখায়।
এ সময় তুহিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল আসছিল। ফোন করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করা মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫)। বিষয়টি তদন্তকারীদের সন্দেহের মধ্যে আনে। পরে ফাহাদকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর তুহিনের কাছ থেকে মো. কামরুল হাসান (১৬) নামে আরেক কিশোরের নাম পাওয়া যায়। তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ।
পরে তিনজনকে একসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত তুহিনই অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। ঘটনার দিন মোবাইল ফোনে ফাহাদ ও কামরুলকে ডেকে নেয় সে। এরপর তাদের সঙ্গে নিয়ে অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অপ্রতিমকে আঘাত করা হয় এবং পরে তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
তদন্তকারীরা আরও বলছেন, ঘটনার পরদিন তুহিন তার সমবয়সী বন্ধু সিয়ামকে (১৯) পুরো ঘটনা জানায়। এ ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ, কামরুল ও সিয়ামকে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।
যেভাবে হত্যাকাণ্ডের তথ্য সামনে আসে
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মোবাইলে ফাহাদের একাধিক কল আসা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে। পরে ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলের নাম সামনে আসে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তবে তাদের জবানবন্দির বিষয়গুলো তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য হিসেবে পাওয়া গেছে।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারও মনে করছেন, তার ছেলেকে আইফোনের জন্যই হত্যা করা হয়েছে। সোমবার সকালে কালবেলার সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, অপ্রতিমের কাছে থাকা ফোনটি ছিল আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স।
ফাহাদ অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী
তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ফাহাদ অপ্রতিমের বাবার মোবাইল সরঞ্জাম বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করত। মাত্র ১৬ দিন আগে সে সেখানে কাজে যোগ দেয়। এখনো তার সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে অপ্রতিমের বাবার মোবাইল সরঞ্জামের শোরুম রয়েছে। তাদের বাসা কুমিল্লার গন্ধমতি কোটবাড়ি এলাকায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ও কাছাকাছি এলাকায় হওয়ায় অপ্রতিমের যাতায়াত ছিল এ অঞ্চলে।
ফাহাদের বাড়িও একই এলাকার কাছাকাছি। সে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি) এলাকার মমিন হোসেন ও জুলি আক্তারের ছেলে। তার বাবা অটোচালক।
পরিবারের অনুরোধে চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর ফাহাদকে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারিম্যানের চাকরি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
পুলিশের ভাষ্য, ফাহাদ ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। হত্যায় জড়িত সবাই বখাটে। অনিয়মিত, কিংবা ঝরে পড়া ছাত্র।
তুহিনকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তুহিনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মোটরসাইকেল বিক্রি কিংবা কেনাবেচার কথা বলে ক্রেতাকে ডেকে এনে জিম্মি করে টাকা লুটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, নীরব নামে তার এক বন্ধু এসব কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। তারা একসঙ্গে মোটরসাইকেল চালাত। অপ্রতিমও তাদের কাছ থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে চালাত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সালমানপুর সানন্দা এলাকার নুরে আলমের ছেলে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, এলাকায় তুহিনের প্রভাব রয়েছে। তবে সেই প্রভাবের উৎস সম্পর্কে তারা নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিপি/কেজে
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
বিকেলে নিউইয়র্কে পৌঁছাচ্ছেন তারেক জিয়া, জেএফকে বিমানবন্দরে আ.লীগ-বিএনপির সমাবেশ
স্পিকারের কাছ থেকে চিঠি পেলে গাজী নজরুলের বিষয়ে ব্যবস্থা: ইসি সচিব
সঙ্গীত একাডেমি