প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প: মধ্যবর্তী নির্বাচন ভুলে ইরানে কাজ শেষ করুন
ছাবেদ সাথী'র তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরান চায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য আমেরিকানরা যুদ্ধ ও ইসরায়েলকে দায়ী করুক। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়ে একমত নন। তাঁর উচিত এসব হইচইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ইরানের ক্ষেত্রে বারবার দেওয়া ‘কাজ শেষ করার’ অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে আবার মনোযোগ দেওয়া।
২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ঘোষণার সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য তুলে ধরেছিলেন: ‘তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা’, ‘তাদের নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন করা’, ‘শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যাতে অঞ্চল বা বিশ্বকে আর অস্থিতিশীল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা’, ‘ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা’ এবং ‘ইরানের সমৃদ্ধ ও গৌরবময় ভবিষ্যতের পথ খুলে দেওয়া’।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো সংকুচিত করা হয়েছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রথম যে নির্দেশটি আড়ালে চলে যায়, তা হলো ইরানি জনগণের প্রতি ট্রাম্পের আহ্বান—‘নিজেদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিন।’ এপ্রিল নাগাদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ইরানের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ করার বিষয়টি আর উল্লেখ করছিলেন না।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রসহ দূরপাল্লার হামলার হুমকি ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকেও ট্রাম্প সরে আসেন। জুনে তিনি বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র সমস্যা নয়।’ আর সর্বশেষ, ভ্যান্স ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের দাবি ছেড়ে দিয়ে শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ‘অর্থবহ’ মাত্রায় কমানোর কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে এখন কেবল ইরানের নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন করার বিষয়টিই অবশিষ্ট রয়েছে। অথচ সেটি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ইরানের সামগ্রিক হুমকির বিচারে তা অনেকাংশেই অপ্রাসঙ্গিক।
অপারেশন এপিক ফিউরি উল্লেখযোগ্য কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। ট্রাম্প যখন দাবি করেন, ইরানকে ‘সামরিক ও আর্থিক—উভয় দিক থেকেই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে’, তখন তিনি অতিরঞ্জন করেন। তবে দেশটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলা যথাযথ হবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের অবকাঠামো এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে। অর্থনীতির প্রাণশক্তি তেল রপ্তানি অনেকাংশে রুদ্ধ হয়ে গেছে। সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের একটি গোটা স্তরকে নির্মূল করা হয়েছে।
কিন্তু এটুকু যথেষ্ট নয়।
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত তার প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছিল। আবারও তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমানের হামলায় ইরানের ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ অধিকাংশ ইউরেনিয়াম মাটির নিচে চাপা পড়লেও দেশটি এখনো সেগুলোর নাগাল পেতে পারে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থলবাহিনী ব্যবহার করে ওই ইউরেনিয়াম বের করে আনার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছিল, কিন্তু ট্রাম্প তা বাস্তবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেন। গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত হওয়ায় বিপজ্জনক বলে বিবেচিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনাটি গত বছরের যুদ্ধ কিংবা এ বছরের যুদ্ধ—কোনোটিতেই হামলার লক্ষ্য করা হয়নি।
পুনরায় সশস্ত্র হয়ে ওঠা ইরানের কারণে আবার সংঘাতে জড়াতে বাধ্য হওয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ট্রাম্পের ভাষায় ‘কাজ শেষ’ করতে পারে এবং তাদের তা করা উচিত। এ জন্য তাঁর মূল পাঁচটি লক্ষ্যে ফিরে গিয়ে সেগুলো পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ ইরানের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা, উপকূলীয় রাডার, অস্ত্রব্যবস্থার ব্যাটারি, ছোট নৌযান নামানোর ঘাঁটি এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিগগিরই নতুন করে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র হামলা চালাতে হবে।
এই অভিযানের মাধ্যমে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো অচল করে দেওয়া এবং ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নির্মূল করার পরিস্থিতিও তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে স্থল অভিযান চালাতে হবে। শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অবকাঠামোর একটি অংশকেও লক্ষ্য করা উচিত। একই সঙ্গে স্পষ্ট সংকেত দিতে হবে, ইরান পাল্টা হামলা চালালে এ ধরনের আরও আঘাত আসবে।
এমন অভিযানে ঝুঁকি থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী এবং আমাদের ইসরায়েলি ও আরব মিত্রদের ভূখণ্ড ইরানের হামলার মুখে পড়বে। অন্তত সাময়িকভাবে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। কিন্তু বিকল্প পথ—ইরানের হুমকি অক্ষত রেখে দেওয়া—আরও ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল।
তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী, নৌবাহিনী ও পারমাণবিক অস্ত্রই প্রধান হুমকি নয়। এগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা হলেও ইরান আবার সেগুলো গড়ে তোলার চেষ্টা করবে অথবা আগ্রাসনের নতুন উপায় খুঁজবে। মূল হুমকি হলো ইরানের শাসকগোষ্ঠী এবং যেকোনো মূল্যে আমেরিকা, ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বকে ধ্বংস করার তাদের সংকল্প। তাই নতুন করে এক দফা হামলা চালালেও কাজ শেষ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে, ইরানের ওপর নজর রাখতে হবে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন ঠেকাতে প্রয়োজনে আবার হামলা চালাতে হতে পারে।
ট্রাম্প তাঁর তালিকা থেকে প্রথম যে লক্ষ্যটি বাদ দিয়েছিলেন, সেখানে ফিরে গেলেই কেবল যুদ্ধের অবসান ঘটবে: তেহরানের উগ্র ও বর্বর শাসকগোষ্ঠীর পতন। ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করা উচিত নয়; তা কেবল শাসকগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখবে। তাদের আরও দুর্বল করা ও পতন ত্বরান্বিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন: শাসকগোষ্ঠীর পক্ষত্যাগে উৎসাহ দেওয়া, তাদের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিরোধ উসকে দেওয়া এবং ইরানের অভ্যন্তরে বিরোধী শক্তিকে শক্তিশালী করা। প্রকাশ্যে সমর্থন জানানো থেকে শুরু করে গোপনে অস্ত্র পাঠানো পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে, যাতে ইরানি জনগণ শাসকগোষ্ঠীর সহিংস বাহিনীকে পরাস্ত করতে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ইতিহাসের আঁস্তাকুঁড়ে পাঠাতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক দাবার ছক বদলায়নি। ইরানের হুমকি এখনো রয়ে গেছে; সেই হুমকি দূর করাই এখনো যুদ্ধ শেষ করার একমাত্র পথ।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি