পথশিশুদের মধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বুড়িগঙ্গা নদী। নদীর বেড়ি বাঁধের পাশেই ছোট একটি ছাউনি। এর মধ্যে বাস করে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন শিশু। সারাদিন বিভিন্ন ধরনের ভাঙ্গারি সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় ফিরে আসে ছাউনিতে।
তারপর প্রায় সবাই পলিথিন মুখে দিয়ে কি যেন করে? তাদের মধ্যে আসাদ নামে এক শিশুকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে জানায়, ছোট বেলায় বন্ধুদের কাছ থাইকা সিগারেট নিয়া খাইছি। তারপর থাইকা গাঁজা আর ফেন্সিডিল খাইছি। এখন ‘ড্যান্ডি লইতে লইতে জীবনটা পেলাসটিক হইয়্যা গেল’। তখনই বোঝা গেল এটি একটি নেশা, আর এই নেশার নাম ‘ড্যান্ডি’।
সম্প্রতি ‘ড্যান্ডি’ আর ‘বাবা’ নামে সহজলভ্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে বেশিরভাগ সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু। ‘ড্যান্ডি’ এক ধরনের আঠা, যা মূলত সলিউশন নামে পরিচিত। এতে টলুইন নামে এক প্রকার উপদান থাকে। টলুইন মাদক দ্রব্যের তালিকায় আছে। এটি জুতা তৈরি ও রিকশার টায়ার টিউব লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এই আঠা পলিথিনের মধ্যে রেখে নিশ্বাস নিলে এক ধরনের নেশা হয়। তখন ক্ষুধা ও শরীরের যন্ত্রণা অনুভূত হয় না। দীর্ঘমেয়াদে এ নেশা শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। মাদক গ্রহণের কারণে তাদের সুষ্ঠুবিকাশ বিঘ্নিত হয়, লেখাপড়ায় ক্ষতি এবং সামাজিকীকরণে সমস্যা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, দেশে ৫৮ শতাংশ পথশিশু মাদকে আসক্ত। ১৪ শতাংশ শিশু ১০ বছরের আগেই মাদক সেবন করে। তুলনামুলক সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় পথশিশুদের মধ্যে ৩১.৭ শতাংশ গাঁজা সেবন করে। ড্যান্ডিতে আসক্ত ১৫.২ শতাংশ শিশু।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতেই ড্যান্ডিতে আসক্ত পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। এই শিশু-কিশোর ছাড়াও বাংলাদেশে প্রায় ৭ মিলিয়নের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে যুক্ত। ৮০ শতাংশ মাদকাসক্তই কিশোর কিংবা তরুণ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দেখা যায়, উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী জেলা এবং ত্রিপুরা সীমান্ত-সংলগ্ন জেলাগুলোতে ফেনসিডিলের চাহিদা সর্বোচ্চ। উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মাদকের তেমন চাহিদা না থাকলেও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী জেলাগুলোতে ইয়াবার চাহিদা রয়েছে। রাজধানীসহ চট্টগ্রামে ইয়াবা, ফেনসিডিল এবং অন্যান্য মাদকের চাহিদা সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অনেক বেশি।
১৯৮৮ সাল থেকে প্রতিবছর ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস (মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস) পালিত হয়ে আসছে। এ বছরে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচাররোধে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং মাদকের চোরাচালান ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণ করে বন্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এ লক্ষ্যে মাদকবিরোধী গণসচেতনতামুলক কার্যক্রম গ্রহণ এবং স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, পাঠ্যপুস্তকে মাদক বিরোধী শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত করার ওপর জোর দেয়া হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অথবা পরিবারে বা সমাজে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত শিশুরাই পরবর্তীকালে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তাই মা-বাবার উচিত সন্তানদের সাথে মাদকের কুফল নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা। সন্তানদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করা। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে, সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, ফেসবুকের বন্ধু কারা, স্কুলের বন্ধু কারা, তাদের বন্ধুদের সাথে কথা বলতে হবে। বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে।
মাদকাসক্ত শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিবারের সকল সদস্যদের সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ দেখাতে হবে। যাদের অভিভাবক নেই, তাদের সহায়তায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা যাবে আমাদের শিশুদের।
বিপি/টিআই
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ইস্যুতে আইএমএফের কোনো শর্ত নেই : ডা. জাহেদ
জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী
সঙ্গীত একাডেমি