ইরানে ‘কাজ শেষ করা’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
ছাবেদ সাথী'র কলাম: তাজা ভাবনা
ছাবেদ সাথী
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ,যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ার পর থেকে একদল ভাষ্যকার দৃঢ়স্বরে বলে আসছেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ‘কাজটা শেষ করা’।
এই আহ্বানকারীদের সাম্প্রতিক কাতারে যোগ দিয়েছেন রেডিও উপস্থাপক ও কলামিস্ট হিউ হিউইট। স্বীকার করতেই হবে, হিউইট ও তাঁর মতামতের প্রতি আমার দীর্ঘদিনের সম্মান আছে। কিন্তু সেটাও সত্য যে, ইরানে ‘কাজ শেষ করতে হবে’ বলে যারা বলছেন, তাঁদের কারও কাছ থেকেই শোনা যাচ্ছে না সেটি কীভাবে সম্ভব, কীভাবে এমন এক মহাকায় ও রক্তাক্ত লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
হিউইট লিখেছেন: সহজ করে বললে, ইরান পৃথিবীর সবচেয়ে অশুভ শাসনব্যবস্থাগুলোর একটি। আর যেহেতু এটি পরিচালনা করছে এমন একদল ধর্মান্ধ, যাদের বিশ্বাসের ভিত গড়ে উঠেছে ‘অন্তিমকাল’কেন্দ্রিক ধর্মতত্ত্ব এবং ‘প্রতিরোধ’-এর ধারণার ওপর যেখানে শহীদ হওয়াও গ্রহণযোগ্য, বরং কাঙ্ক্ষিত তাই এই শাসনব্যবস্থা একেবারেই আলাদা ধরনের বিপজ্জনক। তাদের কখনোই গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মালিক হতে দেওয়া যায় না; এমনকি এমন প্রচলিত অস্ত্রভাণ্ডারও নয়, যা অন্য স্বাভাবিক রাষ্ট্রগুলোকে তাদের থামাতে নিরুৎসাহিত করবে বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে।
কথাগুলো এত পরিচিত শোনায় কেন?
২০০৩ সালের মার্চে জর্জ ডব্লিউ. বুশ প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনও বহু ভাষ্যকার, সম্পাদকীয় লেখক, তথাকথিত বিশেষজ্ঞ ও নব্য-রক্ষণশীল মতাদর্শীরা একইভাবে ইরাকে হামলার পক্ষে কথা বলছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল ‘অশুভ’ সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে, ইরাককে ‘মুক্ত’ করতে হবে। অনেকের কথাবার্তা শুনে মনে হতো, যেন এটি কোনো যুদ্ধ নয় এক ধরনের খেলা বা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যেখানে মানুষ কেবল ঘুঁটি; প্রয়োজনে যাদের চাল দেওয়া যাবে, উৎসর্গও করা যাবে।
কিন্তু হাজার মাইল দূরের বিলাসবহুল দপ্তরে বসে যারা যুদ্ধের পরামর্শ দেন, এই ভয়াবহ খেলায় তাদের নিজের কোনো ঝুঁকি থাকে না। তারা সামরিক বাহিনীতে নেই; আসন্ন যুদ্ধে তারাই সম্মুখসারিতে হাঁটবেন না। তাদের অধিকাংশের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুরাও যুদ্ধক্ষেত্রে থাকবেন না।
শেষ পর্যন্ত ওই ভাষ্যকার ও নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ইচ্ছাই কার্যত বাস্তবায়িত হয়েছিল। কিন্তু কী ভয়াবহ মূল্য দিয়ে? প্রায় ৪,৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হন, আহত হন ৩২ হাজার। গবেষণা ভেদে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত ইরাকি নিহত হন। আর মধ্যপ্রাচ্য এমনভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যার অভিঘাত আজও রয়ে গেছে।
এখন, দুই দশকেরও বেশি সময় পরে, সেই একই ‘বিশেষজ্ঞ’রা আবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চাচ্ছেন।
আমি হিউইট ও অন্যদের সঙ্গে একমত যে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণকারী হত্যাকাণ্ডপ্রবণ শাসনব্যবস্থা ইতিহাসের সবচেয়ে ‘অশুভ’ শাসনগুলোর একটি। কিন্তু ‘অশুভ’-এর সঙ্গে লড়াই করতে গেলে মূল বিষয়টি প্রায়ই লুকিয়ে থাকে সূক্ষ্ম বিশদে। অর্থাৎ, ‘কাজ শেষ করা’ বলতে নির্দিষ্টভাবে কী কী সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে? কে ঠিক করবে কাজটি কখন ‘শেষ’ হলো? আর আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কতজন মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হলে, কতজন ইরানি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারালে, সেটিকে গ্রহণযোগ্য মূল্য বলা হবে?
ষাটের দশকের শেষ দিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধকে বলা হতো ‘লিভিং-রুম ওয়ার’ বা বসার ঘরের যুদ্ধ। কারণ, সে সময়ের টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো যুদ্ধের বিভীষিকা এবং তা ঘিরে রাজনৈতিক প্রতারণা সরাসরি লাখো-করোড়ো আমেরিকানের বসার ঘরে পৌঁছে দিচ্ছিল। তরুণ সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত ও আহত হতে দেখে খুব দ্রুতই আমেরিকান জনগণের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়।
এখন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পাঁচ দশক পরে এবং ইরাক আক্রমণের দুই দশকেরও বেশি সময় পর, জনগণ চাইলে মার্কিন সেনাদের হত্যাযজ্ঞ মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও টেলিভিশনের পর্দায় বাস্তব সময়েই দেখতে পারে ফার্স্ট-পারসন-ভিউ বা এফপিভি যুদ্ধড্রোনের ক্যামেরায়। রাশিয়া ও ইউক্রেন ইতোমধ্যেই এ ধরনের লক্ষ লক্ষ প্রাণঘাতী, তুলনামূলক সস্তা, ফাইবার-অপটিক নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলোতে রকেটচালিত গ্রেনেড বা উচ্চ-বিস্ফোরক শ্রাপনেল চার্জ বহন করা হয়। ধারণা করা হয়, ইরানের কাছেও এমন কয়েক হাজার নয়, কয়েক দশ হাজার ড্রোন রয়েছে।
তাহলে যদি ‘কাজ শেষ করা’ বলতে বোঝায় মার্কিন সেনাদের হাজার হাজার সদস্যকে স্থলযুদ্ধে নামানো, যেখানে তারা এসব মারণাস্ত্রের সামনে উন্মুক্ত থাকবে? যদি ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ মানেই হয়, তরুণ মার্কিন সেনাদের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার ভিডিও একের পর এক প্রকাশ করবে ইরানের সেই ‘অশুভ’ শাসনব্যবস্থা?
হিউইটের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখেই বলছি আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, জাতীয় বিতর্কের বৃহত্তর পরিসরে তাঁর কণ্ঠ একটি প্রয়োজনীয় কণ্ঠ। কিন্তু তাঁকে এবং ইরানে ‘কাজ শেষ’ করার পক্ষে নিয়মিত সওয়াল করা অন্যদের আমি বলতে চাই: দয়া করে স্পষ্ট করে বলুন, এতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন? এর পরিধি কোথায় গিয়ে শেষ হবে? ধ্বংসের ঢেউ কত দূর পর্যন্ত ছড়াবে?
আমার সন্দেহ নেই আমাদের প্রেসিডেন্ট, আমাদের সামরিক কর্মকর্তারা, বিশেষ করে যেসব সেনা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এবং সেই নিরীহ ইরানিরাও, যারা কল্যাটারাল ড্যামেজ' বা পার্শ্বক্ষতির শিকার হতে পারেন সবাই এই প্রশ্নের একটি সুস্পষ্ট, বিস্তারিত উত্তর শুনতে আগ্রহী।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি